
|| অলিউর রহমান খান ||
আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় অনেক ভালোবাসি। তাই ঘুরতে চাই বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তরে। তবে ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশের তিন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাগুলো খুব সুন্দর গন্তব্য। বিশেষ করে বান্দরবানের অনেকগুলি স্থান। আমাদের এবারের গন্তব্য ছিলো বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার কচ্ছপতলীর দেবতাখুম।
ঢাকা থেকে ১৬ জনের একটি দল আমরা গিয়েছিলাম দেবতাখুম ট্র্যাকিংয়ে। বান্দরবান শহর থেকে সকাল আটটায় সকালের নাশতা সারলাম আমরা। আমার সাবেক সহকর্মীদের সাথে ছিল আমার এ সফর। পাহাড়ি কোন ট্র্যাকিংয়ে এটাই আমার প্রথম যাত্রা। বান্দরবান শহর থেকে চান্দের গাড়ি বলে খ্যাত খোলা দু’টি জিপ নিয়ে আমরা রওয়ানা হলাম রোয়াংছড়ির উদ্দেশ্যে। শহর থেকে যত উপরে উঠছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি। চারদিকে সবুজের সমারোহ। উঁচু নীচু পাহাড় আর শুভ্র মেঘের ভেলা আমাদের এক অন্য জগতের হাতছানি দিচ্ছিল। মোবাইলে ছবি ও ভিডিও তুলতে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। এতো সুন্দর আমাদের দেশ! সত্যি এখানে না আসলে বিশ্বাস করতাম না। আমরা যে রাস্তায় যাচ্ছি সেই রাস্তাটি ছিল আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথ। গাড়ি যখন উপরে উঠছিল আমরা তখন বেশ শক্ত হয়ে বসেছিলাম। রোমাঞ্চকর এক অনুভুতিতে আমরা পথ পাড়ি দিচ্ছিলাম।

যেতে যেতে আমাদের গাড়ি এসে থামলো এক সেনা ক্যাম্পের সামনে। সেখানে সবার জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে হলো। জানিয়ে রাখি বিদেশী ভ্রমণকারীদের জন্য তিন পার্বত্য জেলা ভ্রমণে সীমাবদ্ধতা আছে। তারপর আস্তে আস্তে আমরা প্রায় সকাল সাড়ে নয়টায় পৌঁছে গেলাম রোয়াংছড়িতে। সেখান থেকে টিকেট কেটে আমরা কচ্ছপতলীর উদ্দেশ্যে বের হই। কারণ আমাদের মূল ট্র্যাকিং শুরু হবে কচ্ছপতলী থেকে। কচ্ছপতলীতে আবার সেনাবাহিনীর কাছে অনুমতি নিয়ে সবার এনআইডির ফটোকপি দিয়ে আমরা স্থানীয় আদিবাসী গাইড নিয়ে রওয়ানা হলাম খুমের রাজ্য দেবতাখুমের অভিমুখে।

সাবেক সহকর্মী ডেভিড ভাই, মনির ভাই, কামরুল ভাই, পলাশ ভাই, অরুন, এনামুল, রোজেল, কামরুল শেখসহ আমরা সবাই তখন উত্তেজনায় উন্মুখ। ও ভালো কথা, আমরা কচ্ছপতলীতে দুপুরে খাবারের জন্য অগ্রিম অর্ডার করে রেখে গেলাম স্থানীয় পাহাড়ি মুরগি, জুমে চাষ করা চালের ভাত, পাহাড়ি সবজি ও শাক। এরপর আমরা হেঁটে যাত্রা শুরু করলাম। আমাদের সাথে ছিল স্থানীয় ভ্রমণ গাইড পলাশ চংচংয়া ও অমর জয়। তাদের সাথে শুরু হলো আমাদের পথচলা। স্থানীয় কিছু বাড়ির পাশ দিয়ে আমরা হাঁটা শুরু করলাম। অল্প কিছুদূর যেতেই পাহাড়ী ঝিরিপথ পেয়ে গেলাম। সেসময় ছিল ডিসেম্বর মাস, শীতকাল। কিন্তু রোয়াংছড়িতে যেন শরতের নীল আকাশ। দু’পাশে সবুজ আর সবুজ। যত সামনে এগুচ্ছি ততই অসম্ভব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মন প্রাণ ভরে উঠছে। একদমই সরু রাস্তা। বিশেষ করে বলে রাখি, মাত্র একজন হেঁটে যাওয়া যায় এরকম কিছু পথেও আমরা যাচ্ছি। একবার উঁচুতে উঠছি আবার নেমে যাচ্ছি ঝিরিপথে। আমাদের গাইডরা পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তারাসহ ১৮ জনের একটা টিম ছিল আমাদের। তারমধ্যে দু’জন ছিল আমার দুই সহকর্মীর ছেলে। একজনের নাম নাফিস ও সম্ভবত তখন ক্লাস ফোরে ও আরেকজন আবিয়াস ও ছিল ক্লাস নাইনের ছাত্র। ওদের চোখেমুখেও দেখছিলাম অন্যরকম আনন্দ। মাঝে মাঝে আমরা ঝিরিপথে পানির ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। নিচে পিচ্ছিল পাথর ছিল। সেই পাথরে হাঁটা বেশ কষ্টকর। খুবই সাবধানে যেতে হয়েছিল সে সময়। এভাবে প্রায় দেড় ঘন্টা হাঁটার পর আমরা গিয়ে পৌঁছলাম একটা জায়গায় যেখান থেকে দেবতাখুমের টিকেট কাটতে হয়। ভেলা বা নৌকা ও লাইফ জ্যাকেটের জন্য প্রতিজন ১৫০ টাকা ছিল। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে অল্প একটু যাওয়ার পর পেয়ে গেলাম ভেলাকুম। ভেলাকুমে নৌকা করে পাড়ি দিয়ে যেতে হয় দেবতাখুমের নৌকা বা ভেলাতে উঠার জায়গায়। সেখানে পৌঁছে আমরা সবাই লাইফ জ্যাকেট পড়ে নিলাম। স্থানীয় পেঁপে ও কলা খেলাম আর পানি পান করে আমরা দেবতাখুমের জন্য উঠে গেলাম নৌকায়।

আহা কি নিরিবিলি এক পাহাড়ী নিস্তব্ধ জায়গা। দু’পাশে দুই উঁচু পাহাড় যা পাথরের ছিল। মাঝে ছিল এক জলের ধারা। সেই জলপথে আমরা চলছি দেবতাখুমে। অসাধারণ এক অনুভুতি। কিছুটা ভয়ও কাজ করছিল মনে কারণ আমাদের গাইড বলছিলেন এখানে তাদের দেবতাদের বাস। অনেকটা ভৌতিক লাগছিল চারপাশ। প্রায় দশ পনের মিনিট এভাবে চলে আমরা পৌঁছে গেলাম দেবতাখুমের শেষ সীমানায়। পথে দেখা হলো অনেক ভ্রমণকারীদের সাথে। কেউ নিজেরাই ভেলা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন আবার কেউ দলবদ্ধ হয়ে নৌকায় ঘুরছিলেন। দেবতাখুমের শেষ সীমানায় ছিল বেশ বড় বড় অনেকগুলো পাথর। সেখানে ঝর্ণার পানি আসছিল। অনেককে সেখানে গোসল করতে দেখলাম। আমরা নাগরিক জীবন থেকে তখন ছিলাম পুরোপুরি বাইরের এক জগতে। সেখানে ছিল না ফোনের নেটওয়ার্ক। তারপরও প্রকৃতির এ অনাবিল এক নিরিবিলি জগতে এসে নিজেকে আবিস্কার করছিলাম অন্য এক মানুষ হিসেবে। মনে হচ্ছিল এটাই আমার জগত। এখানেই থেকে যাই আমৃত্যু। প্রায় ঘন্টা খানেক অবস্থান করে আবার একইভাবে একইপথে আমরা ফিরে এলাম কচ্ছপতলি। মাঝে নিয়ে এলাম এক অন্যরকম প্রশান্তি। এক অন্যরকম অনুভূতি। আসলেই ভ্রমণে খুলে যায় মনের দরজা। তাই মাঝে মাঝে বেরিয়ে পরুন ভ্রমণে।
স্থানীয় আদিবাসী গাইড:
📞 পলাশ চংচংয়া- 01838717735
📞 অমর জয়- 01834672845
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ঢাকা।
