
অনুলিখন ও গ্রন্থনা: নওশীন শারমীলি
শিক্ষার্থী, আল ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
’জুলাই’—ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ মাস মাত্র। কিন্তু আমাদের স্মৃতি ও চেতনায় এটি শুধু একটি মাস নয়; এটি সাহস, প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার এক চিরন্তন প্রতীক। জুলাই আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছে বাকস্বাধীনতা। বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের সকল শহীদের প্রতি। আন্দোলনের সেই উত্তাল সময়ে বিপ্লবী বন্ধুদের সাথে স্বকণ্ঠে, সমস্বরে জানিয়েছি প্রতিবাদ। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তেমনি কয়েকজন বিপ্লবী বন্ধুর জুলাই বিপ্লবের অমলিন স্মৃতি নিচে তুলে ধরা হলো—
সাহস, ত্যাগ ও জয়ের স্মৃতি
রুবাইয়া
শিক্ষার্থী, আল ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগ
২০২৪ সালের জুলাই আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একজন নারী শিক্ষার্থী হিসেবে আমি রাজপথে নেমেছিলাম। সহযোদ্ধাদের সঙ্গে ব্লকেড কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছি প্রতিবাদের ভাষা। চোখের সামনে অগণিত নিরস্ত্র মানুষের রক্ত ঝরতে দেখেছি, মৃত্যুকে এত কাছ থেকে দেখেছি যে প্রতিটি মুহূর্তে বুক কেঁপে উঠেছে। ভয় ছিল, আতঙ্ক ছিল, পরিবারকে হারানোর শঙ্কাও ছিল—তবুও পিছু হটিনি। কারণ হৃদয়ে বিশ্বাস ছিল, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর চেয়ে বড় সাহস আর কিছু হতে পারে না। সেই রক্তাক্ত জুলাই আমাকে শিখিয়েছে, ভয়কে জয় করেই ইতিহাস লেখা যায়। আজও সেই দিনগুলোর স্মৃতি হৃদয়ে অমলিন। শহীদদের আত্মত্যাগ, আহতদের বেদনা ও মানুষের অসীম সাহস আমাদের আগামী দিনের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। জুলাই কেবল একটি মাস নয়, এটি আমার কাছে সাহস, আত্মত্যাগ ও বিজয়ের চিরন্তন প্রতীক।
হাজার বছরের ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের ইতিহাস
আব্দুল্লাহ আল নোমান
শিক্ষার্থী, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
পৃথিবীর ইতিহাসে আন্দোলন-সংগ্রামের শেষ নেই। জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের প্রতিরোধ যুগে যুগে ঘটেছে, কিন্তু আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের পরিধিতে এমন কোনো আন্দোলনের ইতিহাস জানা নেই, যা ক্যালেন্ডারের তারিখকেই বদলে দিয়েছে। অথচ ‘৩৬ জুলাই’ আজ একটি প্রতীকী তারিখ—বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের অবিস্মরণীয় স্মারক। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিজয়ের অপেক্ষা যেন গিয়ে ঠেকেছিল এই ‘৩৬ জুলাই’-এ।
সেই আন্দোলনের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে প্রতিটি দিনই আমার কাছে স্মৃতিময়। একদিন কর্মসূচিতে অংশ নিতে সিনিয়র ভাই আমির ফয়সালকে সঙ্গে নিয়ে কুষ্টিয়ায় যাই। চৌড়হাস মোড়ে পৌঁছে দেখি, সরকারের মোতায়েন করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান। পরিস্থিতি বুঝে কোর্ট চত্বরের দিকে গেলেও সেখানেও একই দৃশ্য। পরবর্তীতে মজমপুর মোড়ে অবস্থানকালে বন্ধু সুলতানসহ কয়েকজন সহযোদ্ধার ফোন আসে—পুলিশ তাদের ঘিরে ফেলেছে। দূরে অবস্থানরত বড় ভাইদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান মেলেনি। আমরা অনেককে দ্রুত সরে যেতে বললেও কয়েকজন সহযোদ্ধা গ্রেপ্তার হন। কিছুক্ষণ পর আমরাও নিরাপত্তা বাহিনীর নজরে পড়ায় দ্রুত স্থান ত্যাগ করি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, বাঁচতে গিয়ে অজান্তে র্যাবের গলিতে ঢুকে পড়ি! তখনই মনে পড়েছিল সেই প্রবাদ—”যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়।”
সাধারণ জাতির অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প
ত্বকী ওয়াসীফ
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ
বাংলার জুলাই—একটি সাধারণ জাতির মাতৃভূমির জন্য অসাধারণ হয়ে ওঠার ইতিহাস। একটি সাধারণ জাতির মাঝেও শহীদ আবু সাঈদের মতো কিছু সন্তানের প্রয়োজন হয়, যারা দেশের ক্রান্তিলগ্নে হায়নার সামনে বুক চিতিয়ে, দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। আজ “জুলাই” শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সহস্র মায়ের সন্তান হারানোর তীব্র বেদনা; লেখা আছে দেশের জন্য হাজারো মানুষের পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্ব বরণের ইতিহাস। এই জমিন আজ তাঁদের রক্তে উর্বর।
আন্দোলনের একটি পর্যায়ে মনে হয়েছিল—হয়তো আর ঘরে ফেরা হবে না। কিন্তু এই শহীদ ও গাজীরাই আমাদের নতুনভাবে কথা বলতে শিখিয়েছেন, শিখিয়েছেন সাহসী হতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে এবং আত্মমর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে। তাই আজ শহীদ ওসমান হাদীর মতোই স্বর উঁচিয়ে বলতে ইচ্ছা হয়—”জান দেব, জুলাই দেব না।”
রাজপথে ছেলেদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নারী শক্তি
সুমাইয়া জেসমিন
শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান ও উপাত্ত বিজ্ঞান বিভাগ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বা কোটা সংস্কার আন্দোলন দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আমাদের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও ২০২৪ সালের জুলাই মাসের শুরু থেকেই ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি পুনর্বহালের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা ১ জুলাই থেকে আন্দোলন শুরু করেন। এরপর ৪ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় স্থগিত না করায় কার্যত ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপনটি অকার্যকর হয়ে যায়। এই সিদ্ধান্তের পর সারাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয় এবং আন্দোলন জোরালো রূপ নেয়।
এই প্রেক্ষাপটে আমি প্রথম আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি ৫ জুলাই। সেদিন সারাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন” ব্যানারে একযোগে অবস্থান কর্মসূচি, বিক্ষোভ, সমাবেশ এবং সড়ক অবরোধের মতো নানা কর্মসূচি পালন করেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত। ৬ জুলাই থেকে আন্দোলন আরও বেগবান হতে থাকে। আমরা “আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম”, “আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই”—ইত্যাদি স্লোগান দিতে দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে শেখপাড়া বাজার পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল ও র্যালি করি।
৭ জুলাই থেকে আমরা ধারাবাহিকভাবে “বাংলা ব্লকেড” কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করি এবং কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করি। ১১ জুলাই আন্দোলনের একটি ঐতিহাসিক দিন ছিল। সেদিন সারাদেশে অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর টিয়ারশেল ও গুলি চালানোর ঘটনার প্রতিবাদে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ও উত্তাল হয়ে ওঠে। প্রধান ফটকে কঠোর পুলিশি অবস্থান থাকা সত্ত্বেও আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাই। পরবর্তীতে এই দিনটির সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের স্মরণে ১১ জুলাইকে “গণঅভ্যুত্থানে প্রথম প্রতিরোধ দিবস” হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
এই আন্দোলনে মেয়েদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুরু থেকেই মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছে। মিছিল, সড়ক অবরোধ, অবস্থান কর্মসূচি, স্লোগান—সব ক্ষেত্রেই মেয়েদের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। অনেক সময় মেয়েরাই সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছে এবং অন্যদের সাহস জুগিয়েছে। মেয়েদের জন্য এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ সহজ ছিল না; ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, পারিবারিক বাধা, সামাজিক সমালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব ছিল বড় প্রতিবন্ধকতা। তবুও তারা সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছে। এই আন্দোলন আমাকে শিখিয়েছে—ঐক্য, সাহস এবং ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
