
|| লিটন হোসেন | নিজস্ব প্রতিনিধি (নওগাঁ ও জয়পুরহাট) ||
নওগাঁর আমের রাজধানী খ্যাত সাপাহার উপজেলায় সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নিজেদের তৈরি করা নিয়মে ব্যবসা পরিচালনা করছেন আম আড়তদাররা। এতে চরম লোকসান ও ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় আম চাষি ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা। উপজেলার আড়তগুলোতে আম চাষিদের কাছ থেকে মণপ্রতি ৪০ কেজির পরিবর্তে ৫২ কেজি করে নেওয়া হচ্ছে। ‘সাপাহার আম আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিঃ’ নামের একটি সংগঠনের নেতাদের নির্ধারিত এই নিয়মের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই কারো।
সাপাহারের বিভিন্ন আমের আড়ত ঘুরে সর্বত্রই একই চিত্র দেখা গেছে। এ বিষয়ে সাপাহার আম আড়তদার সমিতির সভাপতি কার্তিক সাহার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইমাম হোসেন রিফাতের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসেন রিফাতের অফিসে দীর্ঘ তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়।
মণপ্রতি ৫২ কেজি নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি রাগান্বিত হয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং দাবি করেন যে, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সব জায়গাতেই এই মাপে আম কেনাবেচা চলছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আম পচনশীল কাঁচামাল এবং দুটি ক্যারেটের ওজন ৪ কেজি। তবে সরেজমিনে আড়তের ক্যারেট ওজন করে দেখা গেছে, একটি ক্যারেটের ওজন ১.২৫ কেজি, অর্থাৎ দুটি ক্যারেটের প্রকৃত ওজন ২.৫ কেজি। ফলে সাধারণ সম্পাদকের দেওয়া ৪ কেজির দাবিটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সাধারণ সম্পাদক রিফাতের আচরণের কারণে সাধারণ আম ব্যবসায়ীরা মুখ খুলতে সাহস পান না এবং তার নির্দেশ মানতে বাধ্য হন।
এই অনিয়মের বিষয়ে জানতে সাপাহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রোমানা রিয়াজের কার্যালয়ে গেলে তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকায় কথা বলা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে গত ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে তাঁর সাথে হোয়াটসঅ্যাপ ও সরাসরি মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এরপর হোয়াটসঅ্যাপে বিস্তারিত তথ্য লিখে মেসেজ পাঠানো হলেও ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সদুত্তর দেননি তিনি।
তবে আমের মৌসুমে যানজট নিরসন ও নিরাপত্তার বিষয়ে ভিন্ন তৎপরতা দেখা গেছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সার্কেল এসপি) শ্যামলী রানী জানান, নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের সরাসরি নির্দেশনায় এবং সাপাহার থানার ওসি মোঃ মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে।
এদিকে সাপাহারের পার্শ্ববর্তী পোরসা উপজেলার নোচনাহার বাজারে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং স্বস্তিদায়ক চিত্র দেখা গেছে। সেখানে সরকারি নিয়ম মেনে ৪০ কেজিতেই মণ হিসাব করা হচ্ছে। নোচনাহার আম আড়তদার সমিতির সভাপতি মোঃ জিয়াউর রহমান বলেন, “এখানে সরকারি নিয়মের বাইরে আমরা কোনো কাজ করি নাই এবং করবো না।”
ঢাকা বাদামতলী থেকে আসা পাইকার ও খুচরা আম বিক্রেতারাও জানান, সেখানে ৪০ কেজিতেই আম কেনাবেচা হচ্ছে, যা চাষি ও ব্যবসায়ী উভয়ের জন্যই লাভজনক। ফলস্বরূপ, সাপাহারের তুলনায় পোরসার নোচনাহার বাজারে আম বিক্রি করতে চাষিরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।
