প্রফেসর ড. আ ব ম সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী
সম্প্রতি মাদ্রাসা বোর্ডের রেজিস্টার প্রফেসর এস এম তৌহিদুজ্জামান স্বাক্ষরিত (২১ জুলাই ২০২৬) একটি বিজ্ঞপ্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ রয়েছে—ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে মাদ্রাসার ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীদেরও ফুটবল টিম গঠন করতে হবে। সিদ্ধান্তটি দেশের মুসলিম জনগণকে চরমভাবে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
বাংলাদেশ একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম রাষ্ট্র; যার ৯১ শতাংশই পরম ধার্মিক। এই দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ইসলামী তাহজিব-তামাদ্দুন চর্চার মূল ভিত্তি হলো মাদ্রাসা।
ইসলামী শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, ষষ্ঠ শ্রেণির একজন ছাত্রী অবশ্যই বালেগা। তাদের শারীরিক অবকাঠামো পঞ্চম শ্রেণি থেকেই বিকশিত হতে থাকে। অন্যদিকে ফুটবল একটি অত্যন্ত দৌড়ঝাঁপের খেলা। এমন খেলায় শারীরিক নানাবিধ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঞ্চালিত হওয়াই স্বাভাবিক, যা সম্পূর্ণভাবে ইসলামী পর্দার বিধানের পরিপন্থী। অভিভাবকগণ নিজেদের সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা ও শালীন পরিবেশের আশায় মাদ্রাসায় পাঠান; সেখানে এসে তারা কিভাবে সন্তানকে বেপর্দা হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে ঠেলে দেবেন? তদুপরি, যেকোনো ধরনের খেলাধুলা কেবল নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা দর্শকদের সামনেও প্রদর্শিত হয়।
বাংলাদেশের মানুষ স্বভাবজাতভাবেই ধর্মপ্রাণ। তাঁরা ব্যক্তিজীবনে শতভাগ ইসলামী বিধিবিধান নিখুঁতভাবে পালন করতে পারুন বা না পারুন, সন্তানকে সঠিক নীতি-নৈতিকতায় মানুষ করার আকুল আকাঙ্ক্ষা লালন করেন। এ কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে অনেক অভিভাবক তাঁদের কন্যাশিশুদের সাধারণ স্কুলে না পাঠিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি করাচ্ছেন।
স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাওয়ার তথ্যই এর বড় প্রমাণ। সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপবৃত্তি, পোশাক, ছাতা ও বিনামূল্যে বই বিতরণসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া সত্ত্বেও প্রাথমিকে শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সম্প্রতি একজন নারী এসি ল্যান্ড (সহকারী কমিশনার-ভূমি) প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী হ্রাস ঠেকাতে কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। এর আগে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী একজন জেলা শিক্ষা অফিসারও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নূরানী শিক্ষা পদ্ধতি চালু করার গুরুত্ব অনুধাবন করে পরামর্শ দিয়েছিলেন।
এমনকি বর্তমান মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীও তাঁর একাধিক বক্তব্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক ও ইসলামী শিক্ষা অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে আসছেন।
সরকার যখন ইসলামের ইতিবাচক দিকগুলোকে তুলে ধরার প্রয়াস চালাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে মাদ্রাসা বোর্ডের এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত—যা কোমলমতি ছাত্রীদের বেহায়াপনা ও বেলেল্লাপনার দিকে ধাবিত করতে পারে—তা কেন গ্রহণ করা হলো, তা মুসলিম জনতার কাছে বোধগম্য নয়।
স্বাভাবিকভাবেই মনে করা হচ্ছে, এটি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস ও প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য একটি গভীর চক্রান্তের অংশ। সাধারণ মুসলিম জনগণ কোনোভাবেই এমন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারে না। তাই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও মাদ্রাসা শিক্ষার ভাবমূর্তি রক্ষায় এই নির্দেশনাবলী অতিসত্বর প্রত্যাহারের জন্য সরকারের নিকট বিনীত ও জোর দাবি জানাচ্ছি।
লেখক: সাবেক ডিন, থিওলজী অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
