
|| নিজস্ব প্রতিবেদক ||
একাডেমিয়া পাবলিশিং হাউস লিমিটেড (এপিএল) প্রকাশিত গবেষক ও লেখক মোহাম্মদ আবদুল হাই রচিত ‘বঙ্গে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য চর্চার ইতিহাস’ শীর্ষক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন ও সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১৫ এপ্রিল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরসি মজুমদার আর্টস অডিটোরিয়ামে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহযোগিতায় এই প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. মুমিত আল রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমিয়া পাবলিশিং হাউজ লিমিটেড (এপিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক ড. এম আবদুল আজিজ।
অনুষ্ঠানটির শুভ উদ্বোধন করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ-এর প্রাক্তন ভাইস চ্যান্সেলর ও বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. হারুন-উর-রশিদ আসকারী। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার।
আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এম সাইফুল ইসলাম খান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নূরে আলম, বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা কেন্দ্র ঢাকার পরিচালক ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের জার্মান ভাষার সিনিয়র ফ্যাকাল্টি তানিম নওশাদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুস সবুর খান।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য কেবল একটি ভাষাগত ঐতিহ্য নয়; এটি মানবসভ্যতার এক মহৎ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। বিশ্বসাহিত্যে ফেরদৌসি’র মহাকাব্যিক চেতনা, হাফিজ’র আধ্যাত্মিক প্রেম, শেখ সাদী’র নৈতিক দর্শন, জালালুদ্দিন রুমি’র মরমী উপলব্ধি এবং ওমর খৈয়াম’র যুক্তিবাদী জীবনচিন্তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এই মহৎ সাহিত্যধারা কেবল পারস্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ভারতীয় উপমহাদেশ, বিশেষত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বাংলার জনপদে মধ্যযুগে ফারসি ছিল প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও শিক্ষার ভাষা। মোগল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসনের প্রারম্ভিক পর্যায় পর্যন্ত ফারসি ছিল রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের প্রধান মাধ্যম। ফলে এ ভাষা কেবল রাজদরবারেই সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক পরিসরে প্রবেশ করেছে।
তারা বলেন, বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারে ফারসির অবদান বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ফারসি শব্দ সংখ্যা দুই হাজার থেকে প্রায় আট হাজার। বাংলা ভাষা ও ফারসি ভাষার মধ্যে রয়েছে গভীর আন্তঃসম্পর্ক। এই ভাষাতেই রচিত হয়েছে বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য রত্নসমূহ। সুফি সাধকদের মাধ্যমে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বাংলায় ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। মোগল আমলে প্রশাসন, সাহিত্য, ইতিহাসচর্চা; সব ক্ষেত্রেই ফারসি ছিল প্রধান ভাষা। এ সময় বহু ইরানি কবি, আলেম ও সাহিত্যিক ভারতে আগমন করেন এবং এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁদের রচনাবলি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে। ঢাকার নবাব পরিবারও ফারসি সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তারা আরও বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর কবিতা ও গানে ফারসি শব্দ ও ভাবধারার ব্যবহার বাংলা সাহিত্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বহু বাঙালি সাহিত্যিক ফারসি সাহিত্য অনুবাদের মাধ্যমে পারস্য ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। আধুনিক যুগেও বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে Persian Studies বা Iranology নামে ফারসি ভাষা সাহিত্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। বঙ্গে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যচর্চার ইতিহাস কেবল অতীতের গৌরবগাথা নয়; এটি আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও চিন্তার গভীরে প্রোথিত এক জীবন্ত ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যের পুনর্মূল্যায়ন ও পুনরুজ্জীবন আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। বঙ্গে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য চর্চার ইতিহাস গ্রন্থটিতে তুলে ধরা বাংলায় ফারসি ভাষা ও সাহিত্য চর্চার ইতিহাস-ঐতিহ্য পাঠক মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলবে।
বইটির লেখক মোহাম্মদ আবদুল হাই বলেন, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত ফারসি ভাষার ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরানো। ভাষাটির আধুনিক যে-রূপটি বর্তমানে আমরা দেখি, সেটির বয়সও ১২শ’ বছরের অধিক। ইউনেস্কো ঘোষণা করেছে, ফারসি পৃথিবীর একমাত্র ধ্রুপদী ভাষা যা এখনো জীবন্ত এবং প্রচলিত আছে। দীর্ঘ সাড়ে ছয়শত বছর এ দেশের রাষ্ট্রীয় আইন-আদালত ও সংস্কৃতির ভাষা ছিল ফারসি। বাংলা সাহিত্যের সাথে ফারসি সাহিত্যের তুলনামূলক আলোচনা করলে দেখা যাবে দুটি ভাষা ও সাহিত্য ঐতিহ্যের মানদণ্ডে উভয়েরই রয়েছে সুপ্রাচীন মানবিক ও নৈতিক সাদৃশ্যমূলক জীবনচেতনা। এই জনপদে ইসলাম ধর্ম বহিরাগত হয়েও সর্বমানবিক সুফিবাদী চেতনার কল্যাণে স্থানীয় ধর্মমতের সঙ্গে যে-সহিষ্ণু সম্পর্ক নির্মিত হয়েছে, সেই সম্পর্ক সম্প্রসারণে ফারসি সাহিত্য ও সংস্কৃতি তথা বাংলা ও বাঙালি মানসকে যথেষ্ট পরিপুষ্টতা দিয়েছে। বাংলায় ইসলাম আগমনের পরেও এই জনপদে অপরাপর ধর্মমতের সঙ্গে সহঅবস্থানের জন্য সহিষ্ণুতাবোধ ও সম্প্রীতিচেতনা সম্প্রসারণে বাঙালিরা ফারসি সাহিত্য ও সংস্কৃতির কাছে বহুমাত্রিক ঋণে আবদ্ধ হয়ে আছে।
বইটির ব্যাপারে বক্তারা বলেন, গ্রন্থটি সাহিত্য গবেষণা পরিমন্ডলে মহামূল্যবান সংযোজন। এতে অবিভক্ত বাংলায় ফারসি ভাষার প্রভাব যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়ছে। আধ্যাত্মিক চর্চায়, সুফিবাদ চর্চায়, নীতি ও নৈতিকতা বিকাশে এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণে সামগ্রিক অবদানসহ অবিভক্ত বঙ্গে প্রায় এক হাজার বছরের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য চর্চার ইতিহাস উপস্থাপিত হয়েছে এই গ্রন্থে। গ্রন্থটি থেকে ফারসি সাহিত্যপ্রেমী এবং ভাষাপ্রেমী পাঠক, লেখক, গবেষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ভীষণভাবে উপকৃত হবে।
উল্লেখ্য যে, একাডেমিয়া পাবলিশিং হাউজ লিমিটেড (এপিএল) সৃজনশীল, একাডেমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয়ের সিলেবাস সংশ্লিষ্ট বই প্রকাশ করে আসছে। এপিএল’র লক্ষ্য প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের শিক্ষার পাঠ্যপুস্তক, মানসম্মত রেফারেন্স বই তৈরি করা, মৌলিক ও সংকলন বই প্রকাশ করা এবং বরেণ্য সব লেখক ও গবেষকদের বৈচিত্র্যে উজ্জ্বল নানা বিষয়ক বই প্রকাশনা বৃদ্ধি করা।
