বুধবার, এপ্রিল ২৯

সিরাজগঞ্জসহ সারাদেশে বজ্রপাতে প্রাণহানি: প্রকৃতির এই মরণফাঁদ মোকাবিলায় করণীয়

|| আসাদুল ইসলাম | নিজস্ব প্রতিনিধি (বেলকুচি, সিরাজগঞ্জ) ||

সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের এক ভয়াবহ রূপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বজ্রপাত। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়াসহ দেশের বিভিন্ন কৃষিপ্রধান অঞ্চলে বজ্রপাতে প্রাণহানি এখন প্রাত্যহিক সংবাদের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত কয়েকদিনের আবহাওয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কালবৈশাখী ঝড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বজ্রপাতের তীব্রতা। গত ২৬ এপ্রিল দেশের সাতটি জেলায় এক দিনেই প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ ও তাড়াশ উপজেলায় ফসলের মাঠে কাজ করার সময় দুই কৃষকের করুণ মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া গতকাল ও আজ নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ এবং জামালপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও অন্তত ১০ জনের মৃত্যু সংবাদ পাওয়া গেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত এক দশকে বজ্রপাত বাংলাদেশে অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা প্রতিবছর গড়ে দুই শতাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।

বজ্রপাতের এই তাণ্ডব থেকে বাঁচার জন্য ব্যক্তিগত সচেতনতা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সমন্বয় এখন সময়ের দাবি। আকাশ কালো হয়ে আসা বা ঘন মেঘের গর্জন শোনা মাত্রই খোলা মাঠ, নদীর পাড় কিংবা কৃষি জমি ত্যাগ করে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসা জীবন বাঁচানোর প্রথম শর্ত।

বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, বজ্রপাতের সময় কোনো বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ উঁচু গাছ সহজেই বিদ্যুৎ পরিবাহী হিসেবে কাজ করে। এর পরিবর্তে পাকা দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে অবস্থান করা সবচেয়ে নিরাপদ। যদি কেউ খোলা মাঠে থাকা অবস্থায় আশ্রয়ের সুযোগ না পান, তবে দুই পা একত্রে করে কানে আঙুল দিয়ে মাথা নিচু করে উবু হয়ে বসে পড়া উচিত, যাতে শরীরের উচ্চতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে।

বাড়িতে বা কর্মস্থলে জানালার কাঁচ থেকে দূরে থাকা এবং মোবাইল ফোন বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এড়িয়ে চলা জরুরি। ঘরবাড়িকে নিরাপদ রাখতে আধুনিক ‘আর্থিং’ ব্যবস্থা ও ‘লাইটনিং অ্যারেস্টার’ স্থাপন করা এখন বিলাসী নয়, বরং প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে, সরকারি পর্যায়ে অধিক পরিমাণে তালগাছ বা দীর্ঘজীবী উঁচু গাছ রোপণের যে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। সিরাজগঞ্জের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড স্থাপনের হার বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ মানুষকে আবহাওয়া সংকেত সম্পর্কে সচেতন করা গেলে এই মৃত্যুমিছিল অনেকটাই থামানো সম্ভব।

প্রাকৃতিক এই দুর্যোগকে রুখে দেওয়ার সাধ্য মানুষের না থাকলেও, সঠিক জ্ঞান ও দ্রুত সতর্কতা অবলম্বন করে আমরা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি নিশ্চিতভাবেই কমিয়ে আনতে পারি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *