Monday, July 20

মানিকগঞ্জে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের সংগঠিত করার দায়িত্বে শিক্ষা ক্যাডার জাফর

|| সেলিম মোল্লা | নিজস্ব প্রতিনিধি (মানিকগঞ্জ) ||

আগামী ১৫ই আগস্টের মধ্যেই সকল সাংগঠনিক ইউনিটকে সচল করা, কেন্দ্র থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত পুনঃসংযোগ স্থাপন, নিষ্ক্রিয়দের সক্রিয় করা, সকল পর্যায়ের জনশক্তিকে আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকার প্রধান শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার পথ সুগমের জন্য মহাপরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনে ঘাপটি মেরে থাকা সাবেক আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষক-কর্মচারী, চিকিৎসক সংগঠন, প্রকৌশলী সংগঠন, আইনজীবী সংগঠন, ধর্মীয় সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠনের সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকারের সমর্থক-সুবিধাভোগীরা আবার নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার জন্য দেশে বিশৃঙ্খলা করতে সংগঠিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশেষ সংস্থার দু-একজন কর্মকর্তা বিষয়টির কথা উল্লেখ করে এদিকে সরকারের নজর আছে নিশ্চিত করে জানান, “বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের পর সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মী যারা সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত ছিলেন, তারা অনেকেই ভোল পাল্টে বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি ও নিরপেক্ষ সেজেছেন। বিশেষ করে গত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকার কারণে এই ফ্যাসিস্ট দোসররা অতি উৎসাহিত হয়ে নির্বাচনে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের পক্ষের শক্তির সমর্থক হিসেবে ময়দানে আবির্ভূত হয়েছেন।”

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষক, শ্রমিক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, সংবাদকর্মী, প্রশাসন, পুলিশ, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি, আইনজীবীসহ সকল সেক্টরেই চলছে ফ্যাসিস্টদের পুনর্মিলনের কর্মকাণ্ড। কিছু আওয়ামী নেতা-কর্মী কিছুদিন পালিয়ে থাকলেও বর্তমানে তারা ধর্মীয় লেবাস গায়ে দিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং গোপনে সংগঠন গোছাচ্ছেন। সম্প্রতি তারা আবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনেরও প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমন অভিযোগ উঠেছে এবং বাস্তবে মাঠে তাই দেখা যাচ্ছে।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে একটি নির্ভরযোগ্য বিশেষ সূত্র জানিয়েছে যে, আগামী ১৫ই আগস্টের মধ্যেই তারা সাংগঠনিক চ্যানেলগুলো সচল করবে এবং সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বরের মধ্যেই চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। আগামী শীতে ডিসেম্বর মাস থেকেই সকল লেভেল থেকে শুরু হবে তাদের বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক, সরকার ও দেশবিরোধী কার্যক্রম। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার পথ প্রস্তুত করবে তারা এ বছরের মধ্যেই।

সূত্রটি জানায়, মানিকগঞ্জ জেলার শিক্ষকদের আগামী আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন প্রজেক্টের “প্রধান সমন্বয়ক” হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, আওয়ামী ক্যাডার, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালামের অন্যতম ঘনিষ্ঠজন (ক্যাডার), বিগত সরকারের সময় অনুষ্ঠিত “বিসিএস জেনারেল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন” নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্যানেলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের ক্যাম্পাসে ঢুকতে না দেওয়ার নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী শিক্ষক নেতা, ফ্যাসিস্টদের সময়ে সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জাফর ইকবালকে। ২০১৬ সালের শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে এই জাফর ইকবাল বিএনপি প্যানেলের নেতা, বর্তমান মাউশির মহাপরিচালকসহ কেন্দ্রীয় বিএনপি পন্থী নেতাদের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেয়নি। বিগত ফ্যাসিস্ট সময়ে ক্ষমতার জোর খাটিয়ে এই জাফর ইকবাল বিএনসিসি, স্কাউট, রেডক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন ইউনিটের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়ম করেছেন।

এদিকে, জুলাই আন্দোলনের পরও তিনি ভোল পাল্টে আবার ক্ষমতাশালী হয়েছেন। তিনি বর্তমান বিএনপি পন্থী ও সৎ অধ্যক্ষকে সাত-পাঁচ বুঝিয়ে আবার বিভিন্ন সেক্টরে হস্তক্ষেপ করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন বেশকিছু শিক্ষক-কর্মচারীবৃন্দ। তবে তাদের বক্তব্য হচ্ছে, এই অতি ধড়িবাজ জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কেউ কিছু বললেই সে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়। একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, জাফর ইকবালও বলে বেড়ায়- যে সরকারই আসুক আমাকে কেউ কিছুই করতে পারবে না।

সূত্রটি আরও জানায়, প্রথমে কোনো সিনিয়র শিক্ষককে এই জেলা সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও, তাদের গোপন মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয় কোনো সংখ্যালঘু সিনিয়রকে দায়িত্ব দিলে সহজেই আওয়ামী বলে ধরা পড়ে যেতে পারে। তাই বয়সে ছোট হলেও অতীতের কর্মদক্ষতা, বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সাথে সখ্যতা, পলাতক আওয়ামী নেতাদের সাথে যোগাযোগ ও তাদের নিকট হতে আর্থিক সাপোর্ট পাওয়া ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে জাফর ইকবালকেই এই গুরু দায়িত্ব দেওয়া হয়।

একাধিক গোপন সভায় থাকা সোর্সরা এই সকল তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে, বিভিন্ন সময় সাংবাদিকদের কাছে ঐ বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার জাফর ইকবাল নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করলেও বিগত সময়ের তার একাধিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এদিকে, সব মিলিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের ছাত্র-জনতাসহ দেশপ্রেমিক জনগণ পতিত ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের নিকট জোর দাবি জানিয়েছেন। সেই সাথে বিভিন্ন সেক্টরে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিস্টদের দোসরদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধেও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

রবিন নামে এক জুলাই আন্দোলনকারী বলেন, যেসব কর্মকর্তা বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী নেতাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে, বর্তমানে তাদের অনেকেরই ভালো পোস্টিং হয়েছে এমন অভিযোগ সারা দেশের মতো মানিকগঞ্জেও আছে। পৌর বিএনপির সভাপতি প্রয়াত নাসির উদ্দিন যাদুর ওপর নির্যাতনকারী পুলিশ সদস্য এসআই থেকে পদোন্নতি পেয়ে ওসি হয়েছেন একই জেলায়।

স্থানীয় সুশীল সমাজ মন্তব্য করেন, আসলে মনের দিক থেকে কিংবা আদর্শের দিক থেকে এদের কোনো পরিবর্তন হয়নি বরং এই সুযোগে নিজেদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে তারা আবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। দেশবাসীর প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচিত সরকার, জুলাই আন্দোলনের পক্ষের বিরোধী দলগুলো ও দেশপ্রেমিক জনগণ মিলেই এই পতিত ফ্যাসিস্টদের দেশবিরোধী সকল কর্মকাণ্ড রুখে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *