
|| আলোকিত দৈনিক ডেস্ক ||
রাষ্ট্র সংস্কার, গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবার রাজপথকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতদিন মূলত সভা-সেমিনার, সংবাদ সম্মেলন, রাজনৈতিক সংলাপ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে দলটির কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকলেও আগামী ঈদুল আজহার পর এই কৌশলে বড় পরিবর্তনের আভাস মিলছে। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব এখন ‘ইনডোর রাজনীতি’ থেকে বের হয়ে জনজীবনের নানা সংকটকে সামনে রেখে মাঠমুখী কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথে নামার পরিকল্পনা করছে।
দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সূত্রে জানা গেছে, মূলত আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখেই এই কৌশলগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এনসিপির ধারণা, জাতীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে হলে স্থানীয় পর্যায়ে জনভিত্তি গড়ে তোলা জরুরি, আর তার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে সরাসরি আন্দোলন করা। সেই লক্ষ্যে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট, নাগরিক সেবায় ভোগান্তি, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের অনিয়মের মতো জনমুখী ইস্যু ও রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিকে ঘিরে নতুন কর্মসূচির রূপরেখা তৈরি করছে দলটি। এর অংশ হিসেবে রাজধানীর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পথসভা, গণসংযোগ, বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও নাগরিক সমাবেশের মতো ধারাবাহিক কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তরুণ নেতৃত্বকে সামনে রেখে জনসম্পৃক্ত রাজনৈতিক ভাষা তৈরির দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে তারা।
সম্প্রতি জাতীয় যুবশক্তির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না হলে ঈদের পর সরকারকে চাপে ফেলতে সংসদ ও রাজপথে কর্মসূচি জোরদার করা হবে। এ বিষয়ে সরকারের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলে বিরোধী দল হিসেবে সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করা হবে। কেবল আলোচনা বা ঘরোয়া কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থেকে জনগণের বাস্তব সংকটের পাশে দাঁড়াতে তিনি নেতাকর্মীদের মাঠপর্যায়ে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা তার এই বক্তব্যকে দলটির ভবিষ্যৎ কৌশলের স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার জানান, ঈদের পর সংস্কার ও জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন ইস্যুতে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় মাঠে সক্রিয় হবে এনসিপি, তবে সরকার বাধা দিলে আন্দোলন আরও কঠোর হবে।
এনসিপির নেতাদের মূল্যায়ন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের নিত্যদিনের সমস্যা নিয়ে বড় দলগুলোর দৃশ্যমান তৎপরতা কম এবং সংসদে বিরোধী দলগুলোর ভূমিকাও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। এই শূন্যতাকে একটি রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছে এনসিপি। বিশেষ করে তরুণ ভোটার, শহুরে মধ্যবিত্ত ও প্রথমবারের ভোটারদের মধ্যে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে চায় তারা। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় নতুন কমিটি গঠন, রাজনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অসন্তুষ্ট ও বহিষ্কৃত নেতাদেরও দলে টানার চেষ্টা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নেও নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখতে চাইছে এনসিপি। সংসদীয় সংশোধনের বদলে গণভোটভিত্তিক সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে দলটি। তাদের মতে, বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে সীমিত সংশোধন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য, স্বাধীন বিচার বিভাগ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং নির্বাচনব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ঈদের পর মাঠে সক্রিয় হওয়ার এই পরিকল্পনা এনসিপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে জনমুখী আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলে তাদের সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়বে। তবে এনসিপি যদি ধারাবাহিক কর্মসূচি, সংগঠনের বিস্তার এবং জনজীবনের ইস্যুতে কার্যকর অবস্থান তৈরি করতে পারে, তবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তারা দ্রুতই একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। সব মিলিয়ে ঈদের পর রাজপথে দলটির এই সক্রিয়তা নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা প্রমাণের এক বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
