Wednesday, July 15

বেসরকারি ডায়াগনস্টিক ও মেডিকেল সেন্টারের উত্থান এবং আমাদের স্বাস্থ্যসেবা

বর্তমানে কেবল বিভাগীয় শহরই নয়, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়েও আলিশান নিজস্ব ভবনে কিংবা ভাড়া বাসায় ব্যাঙের ছাতার মতো শত শত ডায়াগনস্টিক ও মেডিকেল সেন্টার গড়ে উঠেছে। হাতেগোনা দু-চারটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া এদের অধিকাংশেরই নিজস্ব কোনো স্থায়ী চিকিৎসক নেই। প্রকৃতপক্ষে, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের ওপর ভর করেই এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান টিকে রয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে যথাযথ নজরদারি এবং চিকিৎসকদের নির্ধারিত সময় পর্যন্ত কর্মস্থলে অবস্থান নিশ্চিতকরণে কর্তৃপক্ষের সঠিক তদারকি না থাকায় এই সুযোগটি তৈরি হচ্ছে। ফলে অধিকাংশ চিকিৎসকই এসব প্রাইভেট মেডিকেল সেন্টারে বিশেষজ্ঞ হিসেবে দেদারসে প্র্যাকটিস করে যাচ্ছেন।

সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে চিকিৎসকদের বিধি মোতাবেক ২৪ ঘণ্টাই অন-ডিউটিতে থাকার কথা। কোনো আর্থিক লাভজনক প্রতিষ্ঠানে একই সাথে অন্য কোনো চাকরি করার সুযোগ তাদের নেই। চাকরিরত অবস্থায় অন্য কোনো দিকে মনোযোগ দেওয়ার আইনি সুযোগ না থাকলেও, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। দিনের যেকোনো সময় রোগী আসলে তাদের ডাক পড়ে। এমন নজিরের অভাব নেই যে, সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের রোগীকে অপেক্ষায় রেখে চুক্তি মোতাবেক প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসকেরা ছুটে যান।

বেসরকারি হাসপাতালের মালিকেরাও এই সুযোগটি লুফে নিয়েছেন। তারা সরকারি হাসপাতালের অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের অল্প পারিশ্রমিকে পেয়ে যান বলে নিজেদের হাসপাতালে স্থায়ীভাবে কোনো চিকিৎসক নিয়োগ দেন না। ঢাকা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত দেশের প্রায় সব সরকারি হাসপাতালেই এই চিত্র দেখা যায়।

হাসপাতাল—তা সরকারি হোক কিংবা বেসরকারি—যেমন রোগ আরোগ্যের জায়গা, তেমনি রোগীদের মৃত্যুর জায়গাও হতে পারে। তবে এই মৃত্যু যদি স্বাভাবিক হয়, তবে বলার কিছু থাকে না; কিন্তু যদি চিকিৎসকের অবহেলার কারণে হয়, তবে সেখানে অবশ্যই জবাবদিহিতার প্রশ্ন থাকে। চিকিৎসকের অবহেলায় কোনো রোগী মারা গেলে তার সম্পূর্ণ দায় প্রথমে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের এবং এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।

কিন্তু কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনায় পুরো হাসপাতালই বন্ধ করে দেওয়া বোধহয় কোনো সভ্য দেশের বিচারে পড়ে না। কারণ, একটি হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশের বেশি নয় এবং চিকিৎসকের অবহেলায় মৃত্যুর হার হয়তো ১ থেকে ২ শতাংশ। আমাদের মনে রাখতে হবে, মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা কোনো সমাধান নয়; বরং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে ব্যথা দূর করাই মূল কাজ। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ক্ষতির চেয়ে লাভের অংশ কতটুকু, ত্রুটির কারণে মানুষ কত শতাংশ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে—এই বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় আনা উচিত।

বেসরকারি হাসপাতালগুলোর অবস্থাও যে খুব সন্তোষজনক, তা কিন্তু নয়। কারণ মালিকপক্ষ মূলত ব্যবসার উদ্দেশ্যেই এগুলো গড়ে তুলেছেন। আর তাদের এই ব্যবসায় সরকারি চিকিৎসকেরা অল্প মূল্যে অভিজ্ঞ সেবা দিয়ে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। এখানে ত্রুটি চিকিৎসক, নার্স ও মালিকপক্ষ সবারই রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে সেবার ঘাটতি থাকার সুযোগটিই বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লুফে নিয়েছে।

তবে এটাও সত্য যে, কিছু কিছু বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে যাদের সেবার মান যেমন ভালো, তেমনি চিকিৎসাব্যয়ও তুলনামূলক কম। সেখানে দরিদ্র রোগীরা ভালো সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলো একেবারে গলাকাটা; যেখানে সরকারি হাসপাতালের চেয়ে অন্তত ৫০ গুণ বেশি ফি নেওয়া হয়। তারপরও বেশি টাকা খরচ করে হলেও মানুষ সরকারি হাসপাতালের চেয়ে বেসরকারিতেই সেবা বেশি পাচ্ছে।

মূল সত্যটি হলো—সরকারি হাসপাতালে কর্তৃপক্ষের সঠিক পর্যবেক্ষণ না থাকা, রোগীদের সুচিকিৎসার অভাব, সেবার মান হ্রাস পাওয়া এবং রোগ নির্ণয়ের যেকোনো রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ সময় লাগাই বেসরকারি ডায়াগনস্টিক ও মেডিকেল সেন্টারগুলোর এই ব্যাপক উত্থানের প্রধান কারণ।

তাই বেসরকারি হাসপাতালগুলোর প্রতি সরকারের নজরদারি বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। হাসপাতাল মালিকদের সাথে সরকারের কার্যকর লিয়াজোঁ থাকা, বেসরকারি হাসপাতাল চালুর ক্ষেত্রে আরও কঠোর শর্ত আরোপ করা, স্বেচ্ছায় কোনো অপরাধ বা গাফিলতি করলে জরিমানার বিধান রাখা এবং অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে রোগী মারা গেলে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এ ধরনের বাস্তবমুখী শর্ত ও নিয়ম আরোপ করে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা সুবিধা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সরকারের অন্যতম বড় দায়িত্ব।

আমাদের দেশে জনসংখ্যা অনুপাতে চিকিৎসকের সংখ্যা খুবই কম। তাই চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধি ও জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতকেই আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যবস্থপনার যে ত্রুটিগুলো রয়েছে, সেগুলোর স্থায়ী ও সময়োপযোগী সমাধান নিশ্চিত করাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *