মঙ্গলবার, মে ৫

ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায়: শাপলা চত্বর গণহত্যার ১৩ বছর

|| নিজস্ব প্রতিবেদক ||

আজ ৫ মে, ইতিহাসের সেই ভয়াবহ ও কলঙ্কিত শাপলা চত্বর গণহত্যার ১৩ বছর। ২০১৩ সালের এই দিনে রাজধানীর মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে নৃশংস অভিযান চালিয়েছিল, তার ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে শত শত পরিবার।

দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ ও প্রচারমাধ্যমের একচেটিয়া সিন্ডিকেট আচরণের কারণে এই নিষ্ঠুর সত্যটি আড়ালে থাকলেও, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এই গণহত্যার বিচারের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।

সেদিনের সেই বিভীষিকাময় রাতে পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযানে কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান আজও মেলেনি। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সম্প্রতি জানিয়েছে, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে অন্তত ৫৭ জনের হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কেবল ঢাকাতেই ৩২ জন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, অভিযানের পর সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি ও তিনটি ট্রাকে করে অসংখ্য লাশ গুম করার অভিযোগ রয়েছে, যা আজও এক অমীমাংসিত রহস্য।

নিহতদের পরিবারগুলোর গল্প আরও হৃদয়বিদারক। কুড়িগ্রামের মাওলানা আব্দুল্লাহ আল নোমান বিয়ের মাত্র ছয় মাসের মাথায় গুলিতে প্রাণ হারান। তার বিধবা স্ত্রী আজও স্বামীর স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন।

অন্যদিকে, নিহত মাদ্রাসা ছাত্র খালিদ সাইফুল্লাহর পরিবারকে এলাকা ছাড়তে হয়েছে এবং নির্যাতনের মুখে বসতভিটা পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। যশোরের মোয়াজ্জেমুল হক নান্নুর পরিবার দীর্ঘ ১২ বছর ধরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, বিগত ১৩ বছরে কেউ তাদের খোঁজ নেয়নি, এমনকি থানায় মামলা পর্যন্ত করতে দেওয়া হয়নি।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই গণহত্যার বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের তদন্তে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩২ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। অভিযুক্তদের তালিকায় আরও রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, তৎকালীন আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও এ কে এম শহীদুল হকসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা।

আগামী ৭ জুন এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করা হয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিচারহীনতার অন্ধকারে থাকা পরিবারগুলো এখন শুধু একটিই দাবি জানাচ্ছেন—দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং এই রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *