
অধ্যাপক মাওলানা মুহাম্মাদ এরশাদ উল্যাহ ভূঁইয়া
মাদ্রাসায় আলিয়া ঢাকায় তাফসির গ্রুপে ভর্তি
জমিয়াতে তালাবায়ে আরাবিয়ার সিদ্ধান্তে ১৯৮১ সালে কামিল হাদিস পরীক্ষা দিয়ে ফেনী থেকে আমি ঢাকায় চলে আসি। ঢাকা আসার পরে কেন্দ্রীয় জমিয়তে তালাবার কাজের সাথে সম্পৃক্ত হই। এরমধ্যে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় তাফসির বিভাগে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করি।
মাদ্রাসা আলিয়ার ছাত্রাবাসের ৩৭০ নম্বর কক্ষে আমার সিট ছিল। সিদ্ধান্ত হলো তালাবায়ে আরাবিয়ার থেকে কিছু ছাত্রকে বিশেষজ্ঞ করে গড়ে তোলার। সে লক্ষ্যে আমাদের কয়েকজনকে নিয়ে একটি গ্রুপ করা হয়। মাদ্রাসা আলীয়ার ‘হেড মাওলানা’ মাওলানা ওবায়দুল হক সাহেবের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হয় যে উনার নিকট ছাত্ররা বিশেষ বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করবেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাদ্রাসায় আলিয়ার ‘হেড মাওলানা’ মাওলানা ওবায়দুল হক হুজুরের নিকট আমারা বিশেষ ক্লাসের শিক্ষা গ্রহণ শুরু করি।
এই গ্রুপে কে কে ছিল সে কথাটি আমার স্মরণে নেই। তবে সাইফ উদ্দিন ইয়াহিয়া ভাই ছিলেন। যিনি এখন আমাদের মধ্যে আর নেই, আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের অধিবাসী করুন। তবে সময়ের অভাবে এই ক্লাসটি বেশি দিন চলেনি।
তখন মাদ্রাসায় আলিয়া ঢাকায় তালাবার কেন্দ্রীয় অফিস ছিল মাদ্রাসা ছাত্রবাসে। ছাত্রশিবির কর্তৃক আব্দুস সোবহান ভাইয়ের শাহাদাতের পরে মাদ্রাসায় আলিয়ায় ছাত্রশিবির কিছুটা কোণঠাসা ছিল। তাই তালাবার কাজ ছিল আলিয়া মাদ্রাসায় প্রকাশ্যে।
একদিনের ঘটনা, আলিয়া মাদ্রাসার হোস্টেলে ধীরে ধীরে ছাত্রশিবির তালাবার উপরে শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা করে। তখন আজিজুল হক মুরাদ ভাই বহিরাগত কিছু লোক ঠিক করেন। তাদের একজন কেরাত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিল। ছাত্রাবাসের মেইন গেট বন্ধ করে দিয়ে ছোট গেটি খোলা রাখা হয়। সে বহিরাগত ব্যক্তি একাই একদিক থেকে শুরু করে ছাত্রশিবিরকে ভয় দেখিয়ে পুরো ছাত্রাবাস থেকে বের হয়ে যাওয়ার হুংকার দেয়। তার হুঙ্কারে যারা ছাত্রাবাসে ছিল একে একে সব ছোট গেট দিয়ে বের হয়ে চলে গেল। সেদিন থেকে অনেকদিন ছাত্রাবাসে ছাত্রশিবিরের কোনো কার্যক্রম বা অবস্থান ছিল না।
মাওলানা মান্নানের সংবর্ধনা
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর প্রেসিডেন্ট এরশাদের শাসনকালে মাওলানা আব্দুল মান্নান পুনরায় মন্ত্রীত্ব লাভ করেন। সিদ্ধান্ত হলো মাদ্রাসা আলিয়ায় তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। মাওলানা মান্নানকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য মাদ্রাসা আলিয়ার মিলনায়তনে ব্যবস্থা করা হলো। ছাত্রদের পক্ষ থেকে সেই দিন আমি তাঁকে মানপত্র পাঠ করে তার হাতে অর্পণ করি।
ছাত্র সংসদ
অনেকদিন হয়ে গেল মাদ্রাসা আলিয়ায় ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। ছাত্রদের পক্ষ থেকে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য জোর দাবি উঠে। তখন মাদ্রাসায় আলীয়ার অধ্যক্ষ ছিলেন জনাব ইয়াকুব শরীফ। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের জন্য সম্মত হন এবং একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করে দেন। ঐ নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার জন্য নোটিশ করা হয়। জমিয়তে তলাবায়ে আরাবিয়া এবং ছাত্রদল একসাথে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয়। মাদ্রাসা আলীয়ার কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তালাবার পক্ষে আমি মুহাম্মদ এরশাদ উল্যাহ ভূঁইয়াকে জিএস পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে আব্দুল মালেককে ভিপি পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়। আব্দুল মালেক এক সময় তালাবায়ে আরাবিয়া করতেন।
আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্রাবাসের ভিপি পদে তালাবার পক্ষ থেকে একেএম মাহবুবুর রহমানকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
(মাকসু) নির্বাচন উপলক্ষে ছাত্রদের মধ্যে খুব আনন্দ উল্লাস দেখা গেল। ব্যাপক প্রচার প্রসারে মিটিং মিছিল শুরু হলো। আমাদের প্যানেল ছিল মালেক-এরশাদ পরিষদ। এ পরিষদের পক্ষে বকশীবাজারের দেওয়ালগুলো দেওয়াল লিখনে ভরে গেল। মালেক-এরশাদ পরিষদ সারা শহরে একটি আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ালো। এই মালেক-এরশাদ কে বা কারা? এই কৌতূহলের কারণ ছিল তখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। সে সময় আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন মালেক উকিল। তাই মালেক-এরশাদ পরিষদ মানুষের মধ্যে জানার কৌতুহল বাড়িয়ে দিল।
তালাবায়ে আরাবিয়ার সমর্থক ভালোই ছিল। তবে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল ছিল। দুঃখের বিষয়- ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে সামনে নিয়ে সংগঠনকে সক্রিয় না করে নির্বাচন বন্ধ করার জন্য বাঁকা পথে গেলেন তালাবার সহ-সভাপতি আজিজুল হক মুরাদ। তিনি আদালতে একজন ছাত্রকে দিয়ে নির্বাচনের উপরে ইঞ্জেকশন জারি করালেন। পরবর্তীতে অভিযোগের বিরুদ্ধে আদালতে আবেদন করা হয়। যে এই অভিযোগটি সঠিক নয়। আদালতে অভিযোগটি সত্য নয় বলে প্রমাণ হলো এবং নির্বাচন করার জন্য নির্দেশ প্রদান করলেন। এর মধ্যে তালাবায়ে আরাবিয়া নির্বাচন থেকে সরে মাঠ ছেড়ে দিয়ে ঘরে বসে গেল। অপরিপক্বতা দূরভিসন্ধিমূলক সিদ্ধান্তের কারণে এভাবে একটি উদীয়মান সংগঠনকে ক্ষতির মুখ দেখতে হয়।
সারাদেশে তালাবার সাংগঠনিক কাজ বেশ সবল ছিল। কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে বিভিন্ন জেলায় সম্মেলনের কেন্দ্রীয় মেহমান হিসেবে গমন করি। তখনো কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন হাফেজ এ টি এম হেমায়েত উদ্দিন, সহ-সভাপতি আজিজুল হক মুরাদ, সেক্রেটারি এম এম সিরাজুল ইসলাম, জয়েন্ট সেক্রেটারি সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাম্মদ এরশাদ উল্যাহ ভূঁইয়া। এম এম সিরাজ ভাইয়ের পূর্বে ঈশা শাহেদী ভাই সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। সেশনের মাঝ পথে ঈশা শাহেদী ভাই দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে সম্ভবত ইরান চলে যান। তখন এম এম সিরাজুল ইসলাম ভাই সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। (চলবে, ইনশাআল্লাহ)
লেখক: কেন্দ্রীয় আমীর, ইসলামী ঐক্য আন্দোলন।
