
|| এস এম শাহরিয়ার | জেলা প্রতিনিধি (খুলনা) ||
খুলনা নগরীর নিরালা এলাকায় এক নারীর বাসায় এক ব্যক্তিকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। পরে ওই ব্যক্তিকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়াকে কেন্দ্র করে কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে এক ব্যক্তির হাতাহাতি ও হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় সাংবাদিকদের মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা কেড়ে নেওয়া এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগীরা।
রবিবার (৩০ আগস্ট) দুপুরে ২৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ের পাশের একটি গলিতে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন। তাদের মধ্যে শেখ তৈয়ব আলী পর্বতকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে খুলনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দুপুরের দিকে মুকুল নামে এক ব্যক্তি আজবা নামের এক নারীর বাসায় প্রবেশ করেন। পরে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে স্থানীয় কয়েকজন ওই বাসায় যান। তারা একটি কক্ষে মুকুল ও আজবাকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পেয়েছেন বলে দাবি করেন।
স্থানীয়দের আরও দাবি, ওই সময় আজবার ছেলে মহশিন বাসার অন্য একটি কক্ষে হেডফোন ব্যবহার করছিলেন।
ঘটনার খবর পেয়ে কয়েকজন সাংবাদিক সেখানে গেলে মুকুলের পরিচয় জানতে চান। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মুকুল প্রথমে নিজেকে বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হেদায়েত লিটন হোসেনের ভাই বলে পরিচয় দেন। পরে তিনি বাগেরহাট জেলা আদালতের নাজির ও পেশকার হিসেবে নিজের পরিচয় দেন।
তবে তার আদালতের পদবি নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে বিষয়টি যাচাইয়ের চেষ্টা করা হয়। আদালত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, মুকুল সেখানে সেরেস্তাদার হিসেবে কর্মরত। এ কারণে তার দেওয়া পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
মুকুলের সঙ্গে বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হেদায়েত লিটন হোসেনের সম্পর্কের বিষয়টিও সাংবাদিকরা জানতে চান। জবাবে হেদায়েত লিটন হোসেন জানান, বিভিন্ন পেশাগত কারণে অনেকের সঙ্গে তার পরিচয় রয়েছে। তবে মুকুল তার ভাই নন এবং তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ কোনো সম্পর্ক নেই।
অন্যদিকে মুকুল সাংবাদিকদের বলেন, আদালতের একটি মামলার বিষয়ে কথা বলতেই তিনি আজবার বাসায় গিয়েছিলেন। আজবাকে তিনি চাচাতো বোন বলেও দাবি করেন। তবে আজবার এক ফুফাতো ভাই মুকুলকে তাদের পরিবারের সদস্য হিসেবে স্বীকার করেননি।
ঘটনার বিষয়ে আজবার বক্তব্য জানতে সাংবাদিকরা যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ক্যামেরার সামনে কোনো বক্তব্য দেননি।
ঘটনাস্থল থেকে মুকুলকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ
স্থানীয়দের দাবি, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে মুকুল ফোনে আবু হোসেন নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে আবু হোসেন ঘটনাস্থলে এসে স্থানীয়দের উপস্থিতিতে মুকুলকে সঙ্গে নিয়ে চলে যান।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আবু হোসেন নিজেকে মরহুম লিটু সাহেবের চাচাতো ভাই হিসেবে পরিচয় দেন। মুকুলকে তার সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কারণ এবং মুকুলের পরিচয় নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এ সময় আবু হোসেন কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং পরে হামলা করেন বলে অভিযোগ করেছেন প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীরা।
মোবাইল-ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ
হামলার ঘটনায় জাতীয় দৈনিক মুখপাত্রের ক্যামেরাপারসন, দৈনিক খুলনার খবরের স্টাফ রিপোর্টার এবং চিটাগাং টাইমসের খুলনা জেলা প্রতিনিধি শেখ তৈয়ব আলী পর্বত আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। একই ঘটনায় ঢাকা টু ডে, চ্যানেল কর্ণফুলী ও আমাদের দিন-এর খুলনা জেলা প্রতিনিধি ফাহিম ইসলামও আহত হওয়ার অভিযোগ করেছেন।
শেখ তৈয়ব আলী পর্বতের অভিযোগ, ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও ভিডিও ধারণের সময় তার মোবাইল ফোনে আঘাত করে সেটি ফেলে দেওয়া হয়। পরে তার ক্যামেরাও নিয়ে নেওয়া হয়।
ফাহিম ইসলাম অভিযোগ করেন, ভিডিও ধারণের সময় তার হাত থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। তার পকেটে থাকা ৫ হাজার ৫০০ টাকাও নিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামলার পাশাপাশি তাদের অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় এবং প্রাণনাশের ভয় দেখানো হয়। সাংবাদিকতা নিয়ে হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি অস্ত্র ও গুলি ব্যবহার করে ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
পরে স্থানীয় বাসিন্দারা আহত শেখ তৈয়ব আলী পর্বতকে উদ্ধার করে খুলনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তার চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ঘটনার পর খুলনা সদর থানা ও নিরালা পুলিশ ফাঁড়িতে বিষয়টি জানানো হয়। একই দিন ৩০ আগস্ট দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে খুলনা সদর থানায় মামলা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
খুলনা সদর থানার ওসি শরিফুল ইসলাম বলেন, “আমরা অভিযোগ পেয়েছি। আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।”
এদিকে, পুরো ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মুকুলের প্রকৃত পরিচয় ও আদালতে তার পদবি, আজবার বাসায় তার যাওয়ার উদ্দেশ্য, আবু হোসেনের সঙ্গে তার যোগাযোগ এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় হামলা, তাদের সরঞ্জাম ও টাকা কেড়ে নেওয়ার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক মহল ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
