
|| শাকির সবুর ||
ভোর পাঁচটা চল্লিশ মিনিটে আমরা উত্তরার আশকোনা হজ্জ ক্যাম্পের উদ্দেশে রওনা হলাম। দুপুর বারটা পঞ্চাশ মিনিটে আমাদের ফ্লাইট। এ বছর ধর্ম মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সব হজ্জযাত্রীকেই ফ্লাইট টাইমের অন্তত ছয় ঘণ্টা আগে আশকোনার হজ্জ ক্যাম্পে উপস্থিত হতে হবে। এর আগের বছরগুলোতে ঢাকায় বসবাসকারী হজ্জযাত্রীদের আশকোনা হজ্জ ক্যাম্পে উপস্থিত না হয়ে সরাসরি এয়ারপোর্টে উপস্থিত হলেও চলতো। তবে এ বছর থেকে আর সেই সুযোগ নেই। কারণ হজ্জযাত্রীদের বোডিং এবং বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন আশকোনা হজ্জ ক্যাম্পেই সম্পন্ন হবে।
শনিবার ছুটির দিন। রাস্তাঘাট ফাঁকাই থাকার কথা। তাই তেমন তাড়াহুড়া নেই আমাদের। তবে আজ সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে হেফাজতে ইসলাম জাতীয় সমাবেশের আয়োজন করেছে। আর আমার বাসা যেহেতু সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের পাশেই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, তাই একটু আগেভাগেই বের হলাম। যাবার সময় দেখি টিএসসি-শাহবাগ এলাকায় লোকসমাগম শুরু হয়ে গেছে। গাড়ি শাহবাগের হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের সামনের ট্রাফিক সিগনাল পার হতেই বিপত্তি বাঁধলো। আমার স্ত্রীর হঠাৎই মনে পড়লো সে তার কোরআন শরীফের সেটটি রেখে এসেছে। বাংলা অনুবাদসহ পাড়া পাড়া ভাগ করা ত্রিশ খণ্ডের কোরআন শরীফের সেট তার। যেটি তাঁর নিত্যসঙ্গী। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় নিয়মিত এই সেট থেকে সূরা ইয়াসিন, সূরা আর রাহমান, সূরা মুলক, সূরা বানি ইসরাইল তেলাওয়াত করে সে। আমি বললাম, মোবাইলে এ্যাপ্স ডাওনলোড করে নিলেই হবে। আমি তো বাইরে গেলে মোবাইল এ্যাপ্স থেকেই কোরআন তেলাওয়াত করি।
কিন্তু সে শান্ত হলো না। বাচ্চাদের মতো আচরণ করতে লাগলো। এবার তাঁর মনে পড়লো চশমাটাও রেখে এসেছে। প্রায়ই তাঁর এমন হয়। কোথাও রওনা করলে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটাই ভুলে থেকে যায়। কী আর করার। অগত্যা ড্রাইভারকে গাড়ি ঘুরাতে বললাম। ছেলেকে ফোন দিয়ে বললাম, সে যেন এগুলো নিয়ে বাসার নিচে নেমে আসে। ফেরার পথে দেখি সমাবেশে আগত লোকজনের ভিড় বেশ বেড়েছে। বাসা থেকে স্ত্রীর চশমা আর কোরআন শরীফের সেটটি গাড়িতে তুলে নিয়ে পুনরায় রওনা হলাম হজ্জ ক্যাম্পের উদ্দেশে। তবে এবার আর টিএসসির পথ ধরলাম না। লোকজনের ভিড় এড়ানোর জন্য ড্রাইভারকে বললাম নীল ক্ষেত হয়ে বাংলা মোটর দিয়ে মূল রাস্তায় উঠতে। দেখলাম এ দিকটায় ভিড় অনেকটা কম। সকাল সাড়ে ছয়টায় আমরা আশকোনার হজ্জ ক্যাম্পে পৌঁছে গেলাম।
আশকোনার হজ্জ ক্যাম্প মোটামুটি সরগরম। এরই মধ্যে বিভিন্ন হজ্জ এজেন্সির লোকজন এবং হজ্জযাত্রীরা এসে গেছেন। কেউ কেউ আসছে। গাড়ি থেকে নেমে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকেই আমাদের এজেন্সির লোকজনও পেয়ে গেলাম। আমরা যাচ্ছি আল বারাকা টুরস এন্ড ট্রাভেলস এজেন্সির মাধ্যমে। এজেন্সির চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম এম কামাল উদ্দিন আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু। গেট থেকে একটু ভেতরে যেতেই তাঁর সাথে দেখা হলো। তিনি এগিয়ে এসে হাসিমুখে আমাদের স্বাগত জানালেন। মূল কম্পার্টমেন্টেই মসজিদ। হাতের ইশারায় সেটি দেখিয়ে দিয়ে তাঁর অফিসের একজনকে আমার সাথে দিয়ে দিলেন এহরাম বাঁধার জন্য।
মসজিদের ভেতর ঢুকে সাথে থাকা এহরামের দুই টুকরো সাদা কাপড় পরে নিলাম। আমাদেরকে অরিয়েন্টেশনের দিনই দেখানো হয়েছে কিভাবে এহরামের কাপড় পরতে হয়। অপেক্ষাকৃত বড় টুকরোটি লুঙ্গির মতো প্যাঁচ দিয়ে বিশেষ কায়দায় গুঁজে নিতে হয়। তবে গিট দেয়া যাবে না। আর ছোট টুকরোটি চাদরের মতো গায়ে জড়াতে হয়। আর কোনো সেলই করা কাপড়, টুপি এসব কিছুই গায়ে জড়ানো যাবে না।
এহরাম বাঁধার পর দু’রাকাত এহরামের নামাজ পড়ে নিয়ত করে মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলাম অন্য এক আমি। পরিচিতজন কেউ আর সহজে চিনতে পারছে না। নিজের কাছের আমাকে অচেনা মনে হলো। মনে মনে প্রার্থনা করলাম, হে খোদা! এই বদলে যাওয়া আমাকেই তুমি কবুল কর। আমার জন্য হজ্জকে সহজ কর এবং কবুল কর। আমার স্ত্রীও মসজিদে মেয়েদের জন্য স্থানে গিয়ে ইতোমধ্যে এহরামের নিয়ত করে নিয়েছিল। সুতরাং আমরা রওনা হলাম। লাগেজ কাউন্টারে।
বেশ ক’বছর থেকেই বাংলাদেশের ধর্মমন্ত্রণালয় হজ্জযাত্রীদের যাত্রার কষ্ট লাঘবের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে তাঁদের লাগেজ যাতে যেদ্দা বিমানবন্দর থেকে কষ্ট করে বহন করতে না হয়, সেই লক্ষ্যে যার যার লাগেজ স্ব স্ব হোটেলে পৌঁছে দেয়া। যেন সঠিকভাবে লাগেজগুলো সঠিক হোটেলে গিয়ে পৌঁছে, সে জন্য প্রত্যেক হোটেলের লাগেজের গায়ে নির্দিষ্ট রঙের স্টিকার এবং বারকোড লাগিয়ে দেওয়া হয়। সুতরাং আমাদেরকে প্রথম লাইন ধরতে হলো হোটেলের স্টিকার লাগানোর জন্য।
আমাদের লাগেজ তেমন নেই। দু’জনের সাথে ছোট দুটি ট্রাভেল ট্রলি। এগুলো আমরা বেল্টে দেবো না। আমাদের সাথেই যাবে। শুধু যেসব জিনিস প্লেনের ভেতরে বহন করা যায় না, যেমন ছুরি, কাচি, তেল জাতীয় তরল, এসব আমরা ছোট্ট একটা ব্যাগে ভরেছি। এই ব্যাগটাই শুধু বেল্টে যাবে।
ইতঃপূর্বে আমার এক বৈমানিক বন্ধু তাঁর হজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন যাবার সময় তাঁর লাগেজ নাকি হারিয়ে গিয়েছিল। তাই তাঁকে এক কাপড়েই হজ্জ করতে হয়েছে। হজ্জের শেষে তিনি তাঁর লাগেজ পেয়েছিলেন। সে কারণে আমি আগেই ঠিক করেছিলাম সাথে বড় কোনো লাগেজ নেবো না। অতি প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় এবং জিনিসপত্র হাতের ট্রলি ব্যাগেই নেবো। যাতে হারাবার সম্ভাবনা না থাকে। ফেরার পথে কেনাকাটা যা করবো সেগুলো কার্টুনে ভরে বেল্টে দিয়ে দেবো। তাই শুধু ছোট্ট ব্যাগটাতেই স্টিকার লাগানোর জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। স্টিকার লাগানো শেষ হলে সেটি আবার অন্য একটা কাউন্টারে জমা দিতে হলো। তারপর আমরা এসে আরেক লাইনে দাঁড়ালাম বোর্ডিঙের জন্য।
লাইন মোটামুটি দীর্ঘই। আমাদের সামনে যারা আছেন তাঁরা সবাই বারাকা হজ্জ কাফেলার হজ্জযাত্রী। তাদের সামনে যারা তারা অন্য এজেন্সির। মোটামুটি স্ব স্ব এজেন্সির লোকজন একসাথেই থাকার চেষ্টা করেছে। এরই মধ্যে আমাদের পেছনে আরেক এজেন্সির বেশ ক’জন হজ্জযাত্রী এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। বারাকার যে সব হজ্জযাত্রী আমাদের পরে এসে আমাদের পেছনে অর্থাৎ তাঁদের আগে যুক্ত হচ্ছেন তাঁদেরকে তাঁরা বাঁধা দিচ্ছেন। তাও খুব রূঢ়ভাবে। তাদের মধ্যে একজন বেশ বয়স্ক। তবে শক্তপোক্ত, সুঠামদেহী। তিনিই সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। কর্কশ ভঙ্গিতে ধমকে উঠছেন, এই খবরদার। লাইনের মাঝখানে কেউ ঢুকতে পারবে না। পেছনে যান।
আমরা তাঁকে মোলায়েম ভাষায় বুঝাতে চেষ্টা করলাম, হাজী সাহেব! এরা সবাই একই এজেন্সির। তাই এজেন্সির লোকদের সাথে একত্রে দাঁড়াতে চাচ্ছে। এতে সুবিধা হচ্ছে প্লেনে একসাথে ছিট পাবে। সবার জন্যই সুবিধা। আপনারাও এক এজেন্সির সবাই একসাথে দাঁড়ান।
তিনি আমার কথায় আরও রেগে উঠলেন, না, না। ওইসব ভক্কি চক্কি চলবে না। সবাই সিরিয়াল মতো আইসা দাঁড়ান। লাইনের মাঝখানে ঢুকন যাইবো না।
আমি বললাম, আপনি এত রাগ করছেন কেন? হজ্জের সফরে তো রাগ হওয়া যাবে না। আপনাদের মুবাল্লিগ সাহেব বলেননি এসব কথা?
-আরে থোন। ওইসব দুই নম্বরি চলবো না।
আমি বললাম, আপনার তাড়া থাকলে আপনি সামনে চলে আসুন।
তাতেও তিনি রেগে গেলেন, না, না। আমি সামনে যামু ক্যান? সবাইরে নিয়ম মানতে অইবো। এজেন্সির লোকজন সব দুই নম্বর।
আমার স্ত্রী আমাকে আর কথা বাড়াতে দিলেন না। ইশারায় আমাকে থামিয়ে দিলেন। পাছে আমিও রেগে যাই! পবিত্র কোরানে আল্লাহ তাআলা হজ্জে কারো সাথে রূঢ় ব্যবহার করতে, অশ্লীল কথাবার্তা বলতে এবং জগড়াজাটি করতে নিষেধ করেছেন। সূরা বাকারার ১৯৭ নম্বর আয়াতে তিনি বলেছেন: ‘হজ্জের মাসসমূহ সুবিদিত। অতএব, যে ব্যক্তি এইসব মাসে হজ্জ ফরজ করবে, (অর্থাৎ হজ্জের নিয়ত করবে।) তার জন্য হজ্জের সময় কোন যৌন সম্পর্ক, কোন অশোভন কাজকর্ম এবং ঝগড়া-বিবাদ করা বৈধ নয়। আর তোমরা যা কিছু সৎকর্ম করো, আল্লাহ তা জানেন। আর তোমরা পাথেয় সাথে নিয়ে নাও। আর সর্বোত্তম পাথেয় হচ্ছে আল্লাহকে ভয় করা। আর হে বুদ্ধিমানগণ, আমাকে ভয় করো।’
সে কারণেই মুবাল্লিকগণ হাজ্জযাত্রীদের প্রশিক্ষণের সময় বিশেষভাবে শতর্ক করে দেন, যেন তাঁরা হজ্জের সফরে কারোসাথে রূঢ় আচরণ না করেন। রাগান্বিত না হন। ধৈর্য্যহারা না হন। সে কথা স্মরণ করেই আমার স্ত্রীর ইশারায় থেমে গেলাম। ভদ্রলোকের সাথে আর কথা বাড়ালাম না। তবে তিনি নিবৃত্ত হলেন না। যেই এসে তার নিজ-এজেন্সির লোকদের সাথে লাইনে যুক্ত হতে চাচ্ছিলেন তাঁর প্রতিই ভদ্রলোক চেচিয়ে উঠছিলেন। আমাদের এজেন্সির চেয়ারম্যান কামাল ভাই ব্যাপারটা দূর থেকে লক্ষ করছিলেন। তিনি এগিয়ে এলেন হাজী সাহেবকে বুঝানোর জন্য। কিন্তু উল্টো ফল হলো। ব্যর্থ হয়ে তিনি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য তাঁর হাতে থাকা হ্যান্ড মাইকে তালবিয়া পড়তে শুরু করলেন। আমরাও তার সাথে গলা মেলালাম, লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক…।
মুহূর্তের মধ্যেই একটা স্বর্গীয় আবহ তৈরি হলো। সবার মুখে মুখে সেই তালবিয়ার পুরো লাইন জুড়েই একটা ঢেউ খেলে গেল। আমরা ধীরে ধীরে ইমিগ্রেশনের দিকে আগাতে লাগলাম। কামাল ভাই আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। তিনি আমাদের সাথে যাচ্ছেন না। তাঁর আরও দুটি কাফেলা ২৯ মে রওনা হবে। তার আগেই তিনি ইউরোপ হয়ে মক্কায় আমাদের সাথে যুক্ত হবেন। আমাদের সাথে যাচ্ছে তাঁর বড় ছেলে তাশফিন আহমেদ। তাশফিন তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসায় আলিমের ছাত্র। মুআল্লিম হিসেবে আমাদের সাথে যাচ্ছেন, তেজগাও মদিনাতুল উলুম মহিলা মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল, কামাল ভাইয়ের ভাতিজি-জামাই মুফতি মওলানা মজির উদ্দিন সাহেব।
ইমিগ্রেশনেই আমাদের বোর্ডিং কার্ড দিয়ে দিলো। তারপর একটা কক্ষের ভেতর গিয়ে বসলাম। অনেকটা ওয়েটিং লাউঞ্জের মতো। সাড়ে আটটার দিকে বেশ কটি বাস এসে দাঁড়ালো হজ্জ ক্যাম্পের সামনে। আমাদের সৌভাগ্য বলা চলে। প্রথম দিকের বাসেই সিট পেয়ে গেলাম। বাস আমাদের নিয়ে বিমানবন্দরের দিকে রওনা হলো। ততক্ষণে শেষ বৈশাখের রোদ তেতে উঠেছে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে পেটের ক্ষুধাও চাড়া দিয়ে উঠেছে। আমরা অবশ্য বাসা থেকে নাস্তা সাথে করে নিয়ে এসেছি। সাড়ে বারটায় ফ্লাইট। এর আগে তো আর কেউ আমাদের খাবার দেবে না। ছয় ঘণ্টার মামলা। তাই বেকারি ব্রেড, কলা, সেদ্ধ ডিম, সামান্য খেজুর এবং পানি সাথে করে নিয়ে এসেছি। বাস চলতে চলতেই সাথের ব্যাগ থেকে সেদ্ধ ডিম বের করে খোসা ছাড়িয়ে খেয়ে নিলাম। আপাতত পেটের ক্ষুধার যোকের মাথায় নুন দেয়া তো হলো!
বাস আমাদের টার্মিনাল ১-এর গেটের সামনে নামিয়ে দিলো। আমরা লাইন ধরে এক এক করে ভেতরে ঢুকতে লাগলাম। প্রবেশ মুখেই স্ক্যানারে সাথের হ্যান্ড ব্যাগ এবং ট্রাভেল ট্রলি স্ক্যান করা হলে স্কাউটের ছেলেমেয়েরা আমাদের পথ দেখিয়ে ওয়েটিং লাউঞ্জের দিকে নিয়ে গেল। যাবার পথে ইউনাইটেড গ্রুপের পক্ষ থেকে আমাদের প্রত্যেকের হাতে হাতে নাস্তার প্যাকেট দিলো। সুন্দর ব্যবস্থাপনা দেখে ভালোই লাগলো। আরও ভলো লাগলো পুরুষ হজ্জযাত্রীদের পরনে শুভ্র-সফেদ পরিচ্ছদ দেখে। মনে হলো চারদিকে কেমন এক স্বর্গীয় আভা ছড়িয়ে আছে।
আমরা ওয়েটিং লাউঞ্জে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ইউনাইটেড গ্রুপের দেওয়া নাস্তার প্যাকেট খুলে খেতে আরম্ভ করলাম। একটা প্যাটিস, একটা স্লাইস কেক, একটা জুসের প্যাকেট আর ছোট এক বোতল পানি। পাশেই হজ্জযাত্রীদের বিমানবন্দরের পক্ষ থেকে ফ্রি চা-কফি সরবরাহ করা হচ্ছে। নাস্তা শেষ করে কেউ কেউ চা-কফিও নিলো। ওয়াশ রুমে গিয়ে প্রয়োজন সেরে অজু করলো। আমিও ওয়াশ রুমে প্রয়োজন সেরে অজু করে নিলাম। যাতে প্লেনে সহসাই আর ওয়াশ রুমে যেতে না হয়।
দেখতে দেখতে আরও হজ্জযাত্রী এসে আমাদের সাথে যুক্ত হলো। বিভিন্ন এজেন্সির। বারাকা হজ্জ গ্রুপের ব্যবস্থাপনায় এবার সর্বমোট ২১০ জন হজ্জযাত্রী হজ্জ করতে যাবেন। আমাদের এই কাফেলায় আমরা যাচ্ছি ৬৫ জন। বাকিরা পরবর্তীতে ২৯ মে’র ফ্লাইটে যাবে। অনেক দিন থেকেই আমি এবং আমার স্ত্রী হজ্জে যাবার জন্য মনোস্থির করেছিলাম। সে লক্ষ্যেই ২০২০ সনে যাবো বলে করোনা মহামারীর আগে ২০১৮ সনে আমরা দুজন প্রি রেজিস্ট্রেশন করে রেখেছিলাম। তখন অবশ্য হজ্জের খরচ কম ছিল বিধায় আগেভাগেই রেজিস্ট্রেশন করে রাখতে হতো। কারণ বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দকৃত হাজী সংখ্যা এক লক্ষ সাতাস হাজার আগেই পুরন হয়ে যেত। তাই আগেভাগেই প্রি-রেজিস্ট্রেশন করে না রাখলে আসন খালি পাওয়া যেতো না। সে কারণে আমরাও আগেভাগেই প্রি-রেজিস্ট্রেশন করে রেখেছিলাম। সেবার অবশ্য প্রি-রেজিস্ট্রেশন করেছিলাম মদিনা হজ্জ এজেন্সির মাধ্যমে। ২০১৯ সালে এজেন্সি-প্রধান জনাব নূরে আলম বললেন, স্যার কোটা খালি আছে। চাইলে এ বছরই যেতে পারেন। কিন্তু সে বছর বড় ছেলের এইচএসসি পরীক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা থাকার কারণে যাওয়া হলো না। ২০২০ সালে চলে এলো করোনা মহামারী। পরের বছর ২০২১ সালে যদিও যাওয়া যেতো কিন্তু করোনা-উত্তর সৌদি হজ্জ মন্ত্রণালয়ের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে মন সায় দিলো না; হজ্জ করতে গিয়ে যদি পবিত্র কাবাঘরই স্পর্শ করতে না পারি, হাজরে আসওয়াদে চুমু খেতে না পারি তাহলে আর যেয়ে লাভ কি? জীবনে একবারই তো যাবো। ২০২২, ২০২৩-এও পারিবারিক এবং পেশাগত ঝামেলার কারণে যাওয়া হলো না। একটা না একটা ঝামেলা এসে হাজির হয়ই। মনের ভেতর উৎকণ্ঠা বাসা বাঁধতে শুরু করল; আমাদের ভাগ্যে কি মহান রাব্বুল আলামিন তাঁর পবিত্র কাবাঘর জিয়ারত করার, হজ্জ করার সৌভাগ্য রাখেন নি! কারণ হজ্জ তো শুধু শারীরিক এবং আর্থিক সামর্থ থাকলেই পালন করা সম্ভব হয় না, নসিবেও থাকতে হয়।
হযরত ইবরাহিম (আঃ) স্বীয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ)-কে নিয়ে যখন পবিত্র কাবাঘর পুনঃনির্মাণ কাজ সমাপ্ত করলেন তখন মহান আল্লাহ তাঁকে বললেন, ‘এবং মানুষের মধ্যে হজ্জের জন্য ঘোষণা প্রচার কর। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে।’ (সূরা হাজ্জ, আয়াত ২৭)। তখন তিনি বিস্মিত হয়েই আল্লাহর কাছে আরজ করলেন: এখানে তো জনমানবহীন মরুপ্রান্তর। এই ঘোষণা শোনার মত কেউ তো এখানে নই; যেখানে জনবসতি আছে সেখানে আমার আওয়াজ কিভাবে পৌঁছবে? তখন আল্লাহ তাআলা ইব্রাহিম (আঃ)-কে বললেন: তোমার দায়িত্ব শুধু ঘোষণা করা। বিশ্বে পৌঁছানোর দায়িত্ব আমার। ইবরাহীম (আঃ) মাকামে ইবরাহীমে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলে আল্লাহ তাআলা তা উচ্চ করে দেন। কোন কোন বর্ণনায় আছে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) আবু কুবায়স পাহাড়ে আরোহণ করে ঘোষণা করেন। দুই কানে অঙুল রেখে ডানে-বামে এবং পূর্ব-পশ্চিমে মুখ করে বললেন: লোক সকল, তোমাদের পালনকর্তা নিজের গৃহ নির্মাণ করেছেন এবং তোমাদের ওপর এই গৃহের হজ্ব ফরজ করেছেন। তোমরা সবাই পালনকর্তার আদেশ পালন কর।’ এই বর্ণনায় আরও বলা হয়েছে যে, ইবরাহীম (আঃ)-এর এই আওয়াজ আল্লাহ্ তাআলা বিশ্বের কোণে কোণে পৌঁছে দেন এবং শুধু তখনকার জীবিত মানুষ পর্যন্তই নয়; বরং ভবিষ্যতে কেয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ আগমনকারী ছিল, তাদের সবার কান পর্যন্ত এ আওয়াজ পৌঁছে দেয়া হয়। যার যার ভাগ্যে আল্লাহ তাআলা হজ্ব লিখে দিয়েছেন, তাদের প্রত্যেকেই এই আওয়াজের জবাবে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ বলেছে। অর্থাৎ, হাজির হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ ইবরাহিমী আওয়াজের জবাবই হচ্ছে হজ্বে ‘লাব্বাইকা’ বলার আসল ভিত্তি। (কুরতুবী, মাযহারী)
পবিত্র কোরআনের এই আয়াতের তাফসির বা ব্যাখ্যা জানার পর থেকেই সব সময় আল্লাহর নিকট এই দোয়া করতাম, হে আল্লাহ আমি তো জানি না, আমি ইবরাহীম (আঃ)-এর সেই আযানের জবাব দিয়েছিলাম কি না! হে আল্লাহ্! যারা ইবরাহীম (আঃ)-এর আযানের জবাবে ‘লাব্বাইকা’ বলেছিল তুমি আমাদেরকে তাদের দলভুক্ত করেছ তো!
স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই মনের ভেতর শংকা আর উৎকণ্ঠা ক্রমেই বাড়ছিল। তাই এবার নানা ঝুটঝামেলা থাকা সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত করে আল্লাহর নামে রওনা হয়েছি। হে আল্লাহ! হে রাব্বুল আলামিন! হে পবিত্র কাবা’র মহান অধিপতি তুমি আমাদেরকে তোমার পবিত্র ঘরের অতিথি হিসেবে কবুল করো। আমাদের হজ্জ সহজ করে দিও। কবুল করো।
সাড়ে এগারোটার দিকে আমাদের ডাক পড়লো। সৌদি আরবের ইমিগ্রেশন এবং চেকইনের জন্য। গত কয়েক বছর থেকেই হাজ্জযাত্রীদের কষ্ট লাঘবের জন্য এই পদ্ধতি চালু হয়েছে। বাংলাদেশ এবং সৌদি আরব উভয় দেশের ইমিগ্রেশনই ঢাকা বিমানবন্দরে সম্পন্ন হয়। জেদ্দা বিমানবন্দরে অবতরণের পর হজ্জযাত্রীগণ সোজা গিয়ে উঠেন তাঁদের জন্য অপেক্ষমান গাড়িতে। গাড়ি আসতে দেরি হলে বাংলাদেশ প্লাজায় অপেক্ষা করেন।
আমরা একাধিক লাইনে দাঁড়িয়ে এক এক করে সৌদি আরবের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে সৌদি এয়ার লাইনসের প্লেনে গিয়ে উঠলাম। আমাদের ফ্লাইট নম্বর এসভি ৩৮০৯। বেশ বড় এয়ার ক্র্যাফ্ট। আসন সংখ্যা ৪২০। প্রবেশ মুখেই বিজনেস ক্লাস। তারপরই ইকনমি ক্লাস। চারটি জোনে ভাগ করা। আমাদের সিট পড়েছে জোন ৩-এ। ঠিক মাঝ বরাবর। সামন-পেছন হিসেবেও মাঝখানে। ডান-বাম হিসেবেও মাঝখানে। অর্থাৎ প্লেনের মধ্যভাগে মাঝখানের সাড়িতে।
সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে যথা সময়েই প্লেন আকাশে ওড়াল দিলো। তখন ঘড়ির কাটা একটা ছুঁই ছুঁই। আকাশ গাঢ় নীল। ভরদুপুরের ঝকঝকে রোদে নিচে ঢাকা শহর দেখা যাচ্ছে। রাস্তাগুলো সরু, সূতার মতো। বড় বড় দালান-কোঠা সিগারেট আর দিয়াশলাইয়ের বাক্সের মতো ছোট ছোট। ক্রমেই আরও ছোট ছোট হতে হতে এক সময় সেগুলো অদৃশ্য হয়ে গেল। এখন চারদিকে শুধু নীল আর নীল। মনে হচ্ছে আমাদের ওপর আর নিচে দুইটি আকাশ। নিচে পাটি বা পৃথিবী বলতে আর কোনো কিছুর অস্তিত্বই নেই। আমাদের দুজনের সিট পড়েছে মাঝখানের সাড়িতে। তাই বাইরের দৃশ্য দেখতে হলে ডান পাশের জানালার দিকে বকের মতো গলা বাড়িয়ে দিতে হয়। ডানের সাড়ির তিনজনকে পেরিয়ে সেই দৃষ্টিতে সবকিছু স্পষ্ট দেখাও যাচ্ছে না। দীর্ঘক্ষণ গলা বাড়িয়ে থাকাও যাচ্ছে না। তাই আমার সামনের পেসেঞ্জার মনিটরে বিমানের যাত্রাপথ দেখতে মনোনিবেশ করলাম। (ক্রমশ…)
লেখক: অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় | লেখার তারিখ: ৩ মে, ২০২৫
