
|| নিজস্ব প্রতিবেদক ||
ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য গৌরবোজ্জ্বল নাম ফাতিমা আল-ফিহরি। তিনি কেবল একজন দানশীল ও বিদুষী মুসলিম নারীই ছিলেন না, বরং বিশ্বের প্রথম ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার গৌরবও তাঁর। ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর ফেজ শহরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ঐতিহাসিক ‘আল-কারাউইয়িন’ বিশ্ববিদ্যালয়, যা সাড়ে ১১শ বছরেরও বেশি সময় ধরে আজও নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। ইউনেস্কো স্বীকৃত এই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি মধ্যযুগে বিশ্ব মেধা চর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

নবম শতাব্দীর গোড়ার দিকে পরম ধার্মিক শাসক দ্বিতীয় ইদ্রিসের শাসনামলে ফাতিমা তাঁর পরিবারের সঙ্গে তিউনিসিয়ার কাইরাওয়ান থেকে মরক্কোর ফেজে পাড়ি জমান। সেখানে তাঁর পিতা মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল-ফিহরি একজন সফল ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে অল্প সময়ের ব্যবধানে বাবা, স্বামী ও ভাইয়ের মৃত্যুর পর ফাতিমা এবং তাঁর বোন মরিয়ম বিপুল সম্পদের উত্তরাধিকারী হন। দুই বোনই তাঁদের অর্জিত সম্পূর্ণ সম্পদ ইসলামের কল্যাণ ও শিক্ষা প্রসারে উৎসর্গ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন।
ক্রমবর্ধমান মুসল্লিদের সুবিধার্থে বোন মরিয়ম নির্মাণ করেন চমৎকার আন্দালুসীয় নকশার একটি মসজিদ। অন্যদিকে ফাতিমা সংলগ্ন সম্পত্তি কিনে মসজিদ প্রাঙ্গণকে বিস্তৃত করেন এবং কাইরাওয়ান শহরের নামানুসারে ‘কারাউইন মসজিদ’ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্ণনা অনুযায়ী, এই নির্মাণকাজ সম্পন্ন হতে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল। ইবাদতে নিবেদিতপ্রাণ ফাতিমা মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু হওয়া থেকে শেষ দিন পর্যন্ত প্রতিদিন রোজা রাখেন এবং কাজ সম্পন্ন হলে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরানা নামাজ আদায় করেন।

মসজিদ নির্মাণের পর পরই ফাতিমা এর বর্ধিতাংশে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়। সেখানে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি ব্যাকরণ, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, ইতিহাস, রসায়ন ও ভূগোলের মতো বিষয়ে ডিগ্রি প্রদান শুরু হয়। বিশ্বের দূরদূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসতেন এবং খোদ ফাতিমা নিজেও কিছুদিন এখানে পাঠ গ্রহণ করেছিলেন। ৯১৮ সালে এটি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে এবং দ্বাদশ শতকের পরিবর্ধনের পর প্রায় ২২ হাজার মুসল্লি ধারণের ক্ষমতা অর্জন করে, যা দীর্ঘকাল উত্তর আফ্রিকার বৃহত্তম মসজিদ হিসেবে পরিচিত ছিল।
শুধু মুসলিম নয়, মধ্যযুগের প্রখ্যাত ইহুদি ও খ্রিস্টান মনীষীরাও এখান থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পোপ দ্বিতীয় সিলভাস্টার, যিনি এখান থেকে আরবি সংখ্যাপদ্ধতি ও ‘শূন্য’ (০)-এর ধারণা শিখে গিয়ে ইউরোপে তা ছড়িয়ে দেন। এছাড়া বিখ্যাত গবেষক ইবনে আল-আরাবি, ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন এবং জ্যোতির্বিদ নূরুদ্দীন আল-বিতরুজির মতো খ্যাতনামা পণ্ডিতেরা বিভিন্ন সময়ে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

কারাউইন ইউনিভার্সিটির সঙ্গে থাকা লাইব্রেরিটিকেও বিশ্বের প্রাচীনতম সক্রিয় লাইব্রেরি হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০১৭ সালে স্থপতি আজিজা চাউনির তত্ত্বাবধানে আধুনিক তাপমাত্রা, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ও ডিজিটাইজেশন ল্যাবসহ এটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়েও এতে ৪ হাজারেরও বেশি দুর্লভ পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে। যার মধ্যে রয়েছে নবম শতকে উটের চামড়ায় কুফিক লিপিতে লেখা কুরআন শরিফ, ইমাম মালিকের ‘মুয়াত্তা’, ইবনে ইসহাকের রাসুল (সা.)-এর জীবনী এবং ইবনে খালদুনের ‘কিতাব আল-ইবার’ ও ‘আল-মুকাদ্দিমা’র মূল পাণ্ডুলিপি।
৮৮০ খ্রিস্টাব্দে ফাতিমা আল-ফিহরি ইন্তেকাল করলেও তাঁর রেখে যাওয়া দূরদর্শী সৃষ্টি আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। মানবজাতিকে আলোকিত করা এবং বিশ্ব জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে ফাতিমার এই অবদান ইতিহাসের পাতায় অম্লান হয়ে থাকবে।
