
|| নিজস্ব প্রতিবেদক ||
বাঙালি মনন, দ্রোহ ও প্রেমের অবিনাশী কণ্ঠস্বর, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার গান, অসাম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রনিনাদ এবং শোষিত মানুষের পক্ষে কলম ধরে তিনি বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য দিগন্তের সূচনা করেছিলেন। আজ সারা দেশে যথাযোগ্য মর্যাদা, আনন্দ ও শ্রদ্ধার সাথে উদযাপিত হচ্ছে কবির জন্মজয়ন্তী।
জাতীয় কবির জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এবারের জন্মজয়ন্তীর মূল আকর্ষণ হিসেবে জাতীয় পর্যায়ের প্রধান অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়েছে কবির স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালে। শনিবার বিকেলে ত্রিশালের নজরুল মঞ্চে আয়োজিত এই তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার শুভ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বর্ণাঢ্য এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী কবি নজরুল গবেষণা ও কবির জীবন-দর্শনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দুইজন গুণী ব্যক্তিত্বের হাতে ‘নজরুল পদক ও সম্মাননা’ তুলে দেন। উদ্বোধনী পর্বের আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে এক ঐতিহাসিক ঘোষণায় ২৫ মে ২০২৬ থেকে ২৫ মে ২০২৭ সাল পর্যন্ত আগামী এক বছরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতীয় পর্যায়ের এ আয়োজনে উপস্থিত মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য ও সুধীসমাজের প্রতিনিধিদের সামনে বক্তারা বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে নজরুলের আদর্শ ও দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সমাজে যখনই ধর্মের নামে বিভেদ কিংবা মানুষে মানুষে অসাম্য তৈরি হয়, তখনই নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ চেতনা আমাদের পথ দেখায়। নজরুল কেবল অতীতের কোনো কবি নন, বরং তিনি আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রতিটি সংকটের অন্যতম দিশারী।
এদিকে আজ ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন কবির সমাধিতে সকাল থেকেই ঢল নামে সর্বস্তরের মানুষের। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে কবির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এছাড়াও বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি এবং নজরুল ইনস্টিটিউটের যৌথ ও একক উদ্যোগে পৃথক আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে কুমিল্লার দৌলতপুর, মানিকগঞ্জের তেওতা, চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গা এবং চট্টগ্রামে তিন দিনব্যাপী বিশেষ নজরুল মেলা, সেমিনার ও বই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।
কবির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান এবং দ্রোহের বাণী তরুণ প্রজন্মকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে চলেছে। ২৪ মে ১৮৯৯ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই মহান ব্যক্তিত্ব তাঁর লেখনীর মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে আত্মমর্যাদাবোধে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর রচিত ‘বিদ্রোহী’, ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’, ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ কবিতা ও গান আজও যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ার প্রধান হাতিয়ার। জাতীয় কবির এই জন্মজয়ন্তী ও ঘোষিত ‘নজরুল বর্ষে’ কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, তাঁর কালজয়ী সৃষ্টিকে তরুণ প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া এবং তাঁর অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী চেতনাকে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করাই হোক আজকের দিনের মূল অঙ্গীকার।
