সোমবার, এপ্রিল ২০

মানিকগঞ্জে অন্যের লাইসেন্স চুরি করে ট্রাভেল এজেন্সির ‘আয়নাবাজি, ভুয়া সাইনবোর্ডে ভয়াবহ প্রতারণা

|| সেলিম মোল্লা | নিজস্ব প্রতিনিধি (মানিকগঞ্জ) ||

মানিকগঞ্জ জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে সরকারি অনুমোদনের ভুয়া সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে অভিবাসন প্রত্যাশীদের সাথে এক ভয়াবহ প্রতারণার মহোৎসব চালাচ্ছে ‘রাজধানী ট্যুর এন্ড ট্রাভেলস’ নামক একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)-এর বৈধ সদস্যের লাইসেন্স নম্বর চুরি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এই চক্রটি। মাসব্যাপী দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই জালিয়াতি ও অবৈধ মানবপাচারের লোমহর্ষক সব তথ্য।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বায়রা নিবন্ধিত বৈধ প্রতিষ্ঠান ‘ফরচুন ওভারসিজ’ (লাইসেন্স নং- ১৮৪৭)-এর পরিচয় ব্যবহার করে মানিকগঞ্জের এই চক্রটি তাদের অবৈধ কার্যক্রম চালাচ্ছে। মানিকগঞ্জ শহরের ‘চাঁদনী রয়্যাল টাওয়ারের’ দ্বিতীয় তলায় অফিস খুলে বসেছে তারা। সরেজমিনে গত ১৯ এপ্রিল সেখানে গিয়ে দেখা যায়, একটি বড় ওয়াল ব্যানারে ফরচুন ওভারসিজের লাইসেন্স নম্বরটি ব্যবহার করে তারা নিজেদের বৈধ প্রমাণ করার চেষ্টা করছে।

এসময়, সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার কাইয়ুম ও তাঁর সহযোগীরা দ্রুত অফিস বন্ধ করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং তথ্য সংগ্রহে বাধা প্রদান করেন। পরবর্তীতে টেলিফোনে কৌশলী আলাপচারিতায় কাইয়ুম স্বীকার করেন যে, ১৮৪৭ লাইসেন্সটি তাঁদের নিজস্ব নয়। এমনকি তিনি বিস্ফোরক মন্তব্য করে বলেন, “মানিকগঞ্জ জেলার কোনো প্রতিষ্ঠানেরই রিক্রুটিং এজেন্সির সরাসরি অনুমোদন নেই, সবাই এভাবেই অবৈধভাবে কাজ চালাচ্ছে।”

এই বিশাল জালিয়াতি চক্রের নেপথ্যে থাকা কথিত মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াসিম আকরামের সাথে কথা বলতে একাধিকবার তাঁর মানিকগঞ্জ ও ঢাকা কার্যালয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁর দেখা পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তাঁর মুঠোফোনে বারবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। একপর্যায়ে সাংবাদিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ করে গা-ঢাকা দেন বলে জানা গেছে।

বায়রা নিবন্ধিত ১৮৪৭ নম্বর লাইসেন্সের আসল মালিক ‘ফরচুন ওভারসিজ’-এর স্বত্বাধিকারী মোঃ নিজাম এই জালিয়াতির খবর শুনে আকাশ থেকে পড়েন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রাজধানী নামের এই প্রতিষ্ঠানটি আমাদের লাইসেন্স চুরি করে ব্যবহার করছে। ওদের দেওয়া ঢাকা অফিসে আমি লোক পাঠিয়ে দেখেছি, সেখানে কোনো অফিসই নেই! ওরা সম্পূর্ণ ভুয়া। আমি ওদের হাতেনাতে পেলে পুলিশে দিতাম। শীঘ্রই এদের বিরুদ্ধে মামলা করব।” তিনি আরও নিশ্চিত করেন, রাজধানীর সাথে তাঁদের কোনো চুক্তি বা শাখা অফিসের সম্পর্ক নেই। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, এই প্রতারক চক্রের কোনো দায়ভার তাঁর প্রতিষ্ঠান নেবে না এবং তিনি এই ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও প্রতারক চক্রকে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানান।

প্রতিষ্ঠানটির ভিজিটিং কার্ডে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করলে মশিউর রহমান নামে এক সাবেক কর্মী জানান, রাজধানীর আড়ালে মূলত অবৈধ মানবপাচার চলে। তিনি বলেন, “চাকরি করাকালীন দেখি ওরা মূল লাইসেন্স মালিকের সাথে ঝামেলা করছে এবং ভুয়া তথ্য দিয়ে লোক পাঠাচ্ছে। বিপদের আশঙ্কায় আমি লিখিত দিয়ে চাকরি ছেড়েছি।” জানা গেছে, মশিউরের নম্বরটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াসিম আকরাম দীর্ঘদিন নিজের পরিচয় গোপন করে প্রতারণার কাজে ব্যবহার করতেন। মূলত ওয়াসিম আকরাম, ম্যানেজার কাইয়ুম ও তাঁর সহযোগী বাহের এই চক্রের নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করছেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

এদিকে, এই চক্রের মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন শত শত যুবক। ভুক্তভোগী শাওন জানান, সাড়ে ৪ লাখ টাকা খরচ করে সচ্ছলতার আশায় বিদেশ গিয়েও তিনি এখন কর্মহীন ও দিশেহারা। অপর প্রবাসী শাকিব জানান, ১৫ মাসের আকামার কথা বলে তাঁকে পাঠানো হলেও দেড় বছরেও আকামা বা কাজ— কোনোটিই পাননি তিনি। বর্তমানে তিনি সেখানে অবৈধ হয়ে পথে পথে ঘুরছেন। একই করুণ অভিজ্ঞতার কথা জানান প্রবাসী অন্তর।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিজেদের এই প্রতারণাকে একপ্রকার শৈল্পিক রূপ দিয়েছে এ ভুয়া প্রতিষ্ঠানটি। চটকদার বিজ্ঞাপন ও আকর্ষনীয় লিফলেট তৈরী করে সাধারণ মানুষদের ঠকানোর এক মহাপরিকল্পনা করেছে এ প্রতারক দলটি।

বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন- ২০১৩ অনুযায়ী, লাইসেন্স ছাড়া বা অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করে কর্মী নিয়োগ দেওয়া একটি গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। এর ৩২। (১) অনুযায়ী কোন ব্যক্তি বা রিক্রুটিং এজেন্ট সরকার বা ব্যুরোর পূর্বানুমোদন ব্যতীত বৈদেশিক কর্মে নিয়োগের উদ্দেশ্যে বা অভিবাসন বিষয়ক কোনো বিজ্ঞাপন প্রকাশ বা প্রচার করলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে এবং এর জন্য ১ (এক) বৎসর কারাদণ্ড এবং অন্যূন ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড হতে পারে।

এছাড়া মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০১২ এর অধীনে প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে লোক পাঠানো এবং সেখানে মানবেতর অবস্থায় ফেলার শাস্তি (ধারা ৬) সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। এছাড়া, যাবজ্জীবনের পাশাপাশি সর্বনিম্ন ৫০,০০০ টাকা অর্থদণ্ডের বিধানও রয়েছে। যদি সংঘবদ্ধ কোনো চক্র বা গোষ্ঠী এই অপরাধের সাথে জড়িত থাকে, তবে অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৭ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডের বিধানও রয়েছে (ধারা ৭)।

এ ব্যাপারে প্রবাসে অবস্থান করে তথ্য সংগ্রহকারী মোঃ সালাহউদ্দিন বলেন, মানিকগঞ্জের এই প্রতারক চক্রের থাপ্পড়ে সউদীতে অবস্থানরত অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি তাদের সর্বস্ব হারিয়েছে। এদের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিদেশে এসে ও পরে অবৈধ হয়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, অতিদ্রুত এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, নয়তো বিদেশি কর্মসংস্থান খাতে দেশ ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

এ প্রসঙ্গে মানিকগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি)-এর অধ্যক্ষ প্রকৌশলী নূর অতএব আহম্মদ বলেন, এই যে ব্যঙ্গের ছাতার মতো যে রিক্রুটিং এজেন্সি বা ট্রাভেল এজেন্সি মানিকগঞ্জে গড়ে উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে অতিদ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া দরকার এবং সঠিক তদন্ত করে তাদের শাস্তি দেওয়া দরকার। ভুয়া আর এল নম্বরগুলো বন্ধ করা প্রয়োজন। এসময় তিনি বায়রাসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এ সকল ভূইফোড় রিক্রুটিং ও ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান।

মানিকগঞ্জের সচেতন নাগরিক সমাজের মনে করছে, দ্রুত ব্যবস্থাগ্রহণের মাধ্যমে এ ধরনের প্রতারণা বন্ধ না করলে দেশ বহির্বিশ্বে হুমকির মুখে পতিত হতে পারে।

সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি খাব্বাব হোসেন ত্বহা বলেন, এই ধরনের জালিয়াতি কেবল সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা নয়, বরং এটি দেশের অভিবাসন খাতের জন্য এক চরম অশনিসংকেত। অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করে ‘আয়নাবাজি’র মাধ্যমে যে চক্রটি বিদেশে লোক পাঠানোর নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তাদের কারণে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বিদেশের মাটিতে দেশের সুনাম নষ্ট হওয়া এবং আমাদের পাসপোর্টের মান কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ এই অসাধু চক্র। আমি মনে করি, এখনই সময় হয়েছে একটি বিশেষ তদন্তের মাধ্যমে এই ভুয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর শিকড় উপড়ে ফেলার। প্রশাসনের দ্রুত ও কঠোর হস্তক্ষেপই পারে হাজার হাজার অভিবাসন প্রত্যাশীর স্বপ্ন রক্ষা করতে।

জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি দপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আওলাদ হোসেন স্পষ্ট জানিয়ে দেন, লাইসেন্স ছাড়া কর্মী পাঠানো অবৈধ। এমনকি শাখা অফিসের জন্যও আলাদা অনুমোদন লাগে। তিনি বলেন, কোনো বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি ছাড়া কেউ বিদেশে কর্মী প্রেরণ করতে পারে না, এটি আইনগতভাবে অবৈধ। যদি এ প্রতিষ্ঠান প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে থাকে এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তবে আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। কোনো প্রতিষ্ঠানের শাখা অফিস তৈরির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বিভাগীয় অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া শাখা অফিস পরিচালনাও অবৈধ। শাখা অফিস পরিচালনার ক্ষেত্রেও একই নাম ও একই তথ্য ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে তথ্য পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই।

সব মিলিয়ে, ‘রাজধানী ট্যুর এন্ড ট্রাভেলস’-এর এই কর্মকাণ্ড কেবল একটি ব্যবসায়িক জালিয়াতি নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল। অন্যের লাইসেন্স ব্যবহার করে পরিচয় চুরির এই ‘আয়নাবাজি’র আড়ালে কত শত পরিবারের স্বপ্ন ধুলোয় মিশেছে, তার ইয়ত্তা নেই। প্রশাসন যদি দ্রুত এই চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় না আনে, তবে আরও অনেক অসহায় যুবক এমন প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে নিঃস্ব হবে। এখন দেখার বিষয়, বিএমইটি ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই ‘ভুতুড়ে’ প্রতিষ্ঠানের তালা ভেঙে ভুক্তভোগীদের দীর্ঘশ্বাসের বিচার নিশ্চিত করতে কতটা তৎপর হয়।

জনস্বার্থে এই জালিয়াতির শেকড় উপড়ে ফেলাই এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *