|| মির্জা ওয়ালিদ হোসেন শিপন ||
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর এক অবিস্মরণীয় ও তাৎপর্যমণ্ডিত দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি-জনতার অভূতপূর্ব ঐক্য ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা পেয়েছিল। তৎকালীন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট, বিদেশি আধিপত্যবাদী শক্তির চক্রান্ত এবং ক্ষমতার একচ্ছত্র দখলের পাঁয়তারা যখন দেশকে একটি অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল, ঠিক তখনই রাজপথে নেমে এসেছিল সাধারণ সিপাহি ও জনতা।
সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ক্যান্টনমেন্টের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। তাঁর কাঁধে অর্পিত হয় দেশ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব। আজ পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ১৯৭৫ সালের সেই পটভূমি এবং বর্তমান বাংলাদেশের প্রাসঙ্গিকতা গভীরভাবে উপলব্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতি এক চরম অস্থিতিশীলতা, ক্ষমতার শূন্যতা ও বহুমাত্রিক সংকটের মুখে পড়েছিল। তৎকালীন সময়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে একটি প্রভাবশালী চক্র দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করার চক্রান্তে লিপ্ত ছিল। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে তৎকালীন সেনাপ্রধানের বন্দিদশা দেশকে এক গৃহযুদ্ধ ও বৈদেশিক আধিপত্যের ঝুঁকিপূর্ণ মুখে দাঁড় করায়।
এমতাবস্থায়, দেশের সিপাহি সমাজ ও সাধারণ মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে হলে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা সবার আগে প্রয়োজন। ৭ নভেম্বর সিপাহি ও জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে নেমে আসে এবং সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসা জিয়াউর রহমান দেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত করেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন এবং উৎপাদনের রাজনীতি ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণার মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার ঐতিহাসিক প্রয়াস চালান।
আজ দীর্ঘ সময় পর, বিশেষ করে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বর্তমান বাংলাদেশে, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের চেতনা ও পটভূমি নতুন এক তাৎপর্যে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সামনে প্রধান কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যার সাথে ১৯৭৫ সালের সংকটের একটি তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক মিল খুঁজে পাওয়া যায়:
১. আধিপত্যবাদ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা
১৯৭৫ সালের মতো আজও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি আধিপত্য, হস্তক্ষেপ এবং দেশের স্বার্থবিরোধী নানা চক্রান্তের বিষয়ে দেশের মানুষ অত্যন্ত সজাগ। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় সব ধরনের পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে একটি আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সিপাহি-জনতার মতো আজও দেশের জনগণ যেকোনো উপায়ে দেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপসহীন থাকতে চায়।
২. গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধার
৭ নভেম্বর বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথকে প্রশস্ত করেছিল। দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসন ও ভোটাধিকার হরণের পর বর্তমান বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার এক সোনালী সুযোগ তৈরি হয়েছে। ১৯৭৫ সালের পটভূমি আমাদের শেখায় যে, জনগণের মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং ভোটাধিকার খর্ব করে কোনো সরকার বা চক্র দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া রাষ্ট্রে প্রকৃত স্থিতিশীলতা অর্জন অসম্ভব।
৩. জাতীয় ঐক্য ও সংহতি
তাত্ত্বিকভাবে ৭ নভেম্বর কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল সিপাহি ও জনতার মেলবন্ধনের প্রতীক। বর্তমান বাংলাদেশে জাতিগত মেরুকরণ, বিভাজন এবং অনাস্থা দূর করতে এক ইস্পাতসম জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। বিভেদের দেয়াল ভেঙে সব মত ও পথের মানুষকে দেশের স্বার্থে একত্রিত হওয়ার শিক্ষাটি আমরা ৭ নভেম্বরের ইতিহাস থেকেই নিতে পারি।
৪. আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা
রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা বর্তমান সময়ের মূল দাবি। ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান যেভাবে উৎপাদনমুখী রাজনীতি এবং শৃঙ্খলার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, আজকের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো মেরামতেও ঠিক তেমনি দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন রয়েছে।
৫. তরুণ প্রজন্ম ও দেশগঠনে অংশগ্রহণ
বর্তমান বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি হলো দেশের তরুণ সমাজ ও ছাত্র-জনতা। ১৯৭৫ সালের সিপাহি-জনতার বিপ্লবেও তরুণ ও যুবসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। আজকের দিনে মেধা, প্রজ্ঞা ও তারুণ্যের উদ্দীপনাকে কাজে লাগিয়ে একটি দুর্নীতিমুক্ত, আধুনিক ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই ৭ নভেম্বরের প্রকৃত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস আমাদের কেবল অতীতের একটি স্মৃতির দিন নয়, এটি বর্তমানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার এক অফুরন্ত প্রেরণার উৎস। ১৯৭৫ সালের সিপাহি-जनতার ঐক্যের মূল বার্তাটি ছিল—দেশের স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকারের প্রশ্নে কোনো আপস নেই। আজকের স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত—সকল প্রকার সংকীর্ণতা ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়া। একটি শক্তিশালী, সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক এবং সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়তে ৭ নভেম্বরের চেতনা আমাদের চিরকাল পথ দেখাবে।
লেখক: সাবেক সভাপতি, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ইবি শাখা ও কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক
