শনিবার, জুন ৬

প্রকৃতি বাঁচলে বাঁচবে ভবিষ্যৎ: নাগেশ্বরীতে বিশ্ব পরিবেশ দিবসে সচেতনতার সবুজ বার্তা

|| কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ||

প্রকৃতি মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। নদী, গাছ, মাটি, বাতাস ও জীববৈচিত্র্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই পরিবেশই মানবসভ্যতার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে হাজার বছর ধরে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, পরিবেশ দূষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অযৌক্তিক ব্যবহারের ফলে আজ প্রকৃতি নানা সংকটের মুখোমুখি। এই বাস্তবতায় ৫ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হলো আন্তর্জাতিক পরিবেশ দিবস-২০২৬। এরই অংশ হিসেবে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার বেরুবাড়ি ইউনিয়নের শালমারা ইসলামিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী সচেতনতামূলক কর্মসূচি।

“প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।” প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে Actions to Climate Change Ensuring Sustainable Solutions (ACCESS) Project-এর আওতায়, সহযোগিতায় হেলভেটাস সুইস ইন্টারকোঅপারেশন , বাংলাদেশ এবং ইএসডিও (ESDO)-এর বাস্তবায়নে আয়োজিত এ কর্মসূচি শুধু একটি দিবস উদযাপনেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল পরিবেশ রক্ষার সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার একটি প্রয়াস।
সকাল থেকেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। শিক্ষার্থীদের হাতে পরিবেশ রক্ষার বার্তা সম্বলিত প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন। আলোচনা সভায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকদের অংশগ্রহণে উঠে আসে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা এবং তা মোকাবিলায় করণীয় বিষয়গুলো।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, নদীভাঙন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব জীবনধারা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

বেরুবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সোলায়মান আলী বলেন, “প্রকৃতি আমাদের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি গাছ কেবল ছায়া দেয় না, এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে। তাই পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।”

শালমারা ইসলামিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শামসুল হুদা মণ্ডল তাঁর বক্তব্যে বলেন, “শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে একটি দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হবে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের পৃথিবীর রক্ষক। তাই তাদের হাতে সবুজ পৃথিবীর বার্তা তুলে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।”

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ইএসডিও’র নলেজ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি অফিসার মো. আতিকুজ্জামান রাজিব বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রকৃতিনির্ভর সমাধান অত্যন্ত কার্যকর। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে বৃক্ষরোপণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।”

আলোচনা শেষে শিক্ষার্থী ও অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে একটি সচেতনতামূলক র‍্যালি বের করা হয়। র‍্যালিটি বিদ্যালয় এলাকা ও আশপাশের সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে বিদ্যালয় সংলগ্ন বাজারে সাধারণ মানুষের মাঝে পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তারা প্লাস্টিক দূষণ রোধ, বৃক্ষরোপণ বৃদ্ধি, জলাশয় সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ও সড়কের পাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করা হয়। আয়োজকদের মতে, পরিবেশ দিবসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে যদি একটি গাছও সঠিকভাবে পরিচর্যা করা হয়, তবে সেটিই হবে দিবসটির সবচেয়ে বড় অর্জন।

দিনের শেষ পর্বে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে পরিবেশ বিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিক্ষার্থীরা পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে নিজেদের জ্ঞান ও সচেতনতার পরিচয় দেয়।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের এই আয়োজন স্থানীয় জনগণের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দিয়েছে—পরিবেশ রক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি মানুষের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। প্রকৃতি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, আর মানুষ বাঁচলেই নিরাপদ থাকবে ভবিষ্যৎ।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই বৈশ্বিক সংকটের সময়ে নাগেশ্বরীর একটি বিদ্যালয়ে আয়োজিত ছোট্ট এই কর্মসূচি যেন মনে করিয়ে দিল, পরিবর্তনের শুরু হতে পারে একেকটি গাছ, একেকটি সচেতনতা এবং একেকটি দায়িত্বশীল পদক্ষেপ থেকে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে আজই প্রয়োজন প্রকৃতির পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *