Tuesday, July 14

চিলমারী সরকারি কলেজের প্রশাসনিক কক্ষেই অধ্যক্ষের বাস!

|| কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ||

কুড়িগ্রামের চিলমারী সরকারি ডিগ্রি কলেজের প্রশাসনিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় উঠলেই বোঝা যায়—এই কক্ষ যেন কোনো সরকারি অফিস নয়, বরং এক বসতবাড়ির দৃশ্য। জানালার পাশে পর্দা টানানো, টেবিলের ওপর জগ, প্লেট ও থালা। কোণে বিছানা, পাশে কাপড় ঝোলানোর দড়ি। অথচ কক্ষটি কলেজের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল রুম) — যেখানে প্রশ্নপত্র সংরক্ষণ ও পরীক্ষার দায়িত্ব পালনের কথা।

অভিযোগ, কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. মজিবল হায়দার চৌধুরী সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে এই প্রশাসনিক কক্ষকেই দীর্ঘদিন ধরে নিজের বাসস্থানে পরিণত করেছেন। এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও পরীক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষক ও কর্মচারীরা।

কলেজের একাধিক শিক্ষক ও কর্মচারী জানান, চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে অধ্যক্ষ ওই কক্ষেই রাতযাপন করছেন। প্রশাসনিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থান করে তিনি দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করলেও, রাতে ওই কক্ষেই অবস্থান করেন।

শিক্ষকদের ভাষায়, “পরীক্ষা চলাকালে ওই কক্ষ ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু স্যার সেখানে থাকায় আমরা সমস্যায় পড়ি।”

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রশাসনিক ভবনের দ্বিতীয় তলার ওই কক্ষে রয়েছে বিছানা, কাপড় রাখার দড়ি, টেবিল, চেয়ার, ফ্যান এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দিকে অধ্যক্ষ সেখানে রান্না করতেন। এখন কলেজের এক কর্মচারীর বাড়ি থেকে নিয়মিত খাবার সরবরাহ করা হয়।

শিক্ষকদের আরেক অংশ অভিযোগ করেছেন, অধ্যক্ষ একাদশ শ্রেণির দুটি কক্ষের দেয়াল ভেঙে বড় করার কাজও শুরু করেছেন, যা অনুমোদনবিহীন।

শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক প্রভাষক এ কে এম গোলাম ফারুক বলেন,“দেয়াল ভাঙার বিষয়ে আমাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে রেজুলেশন লেখানো হয়েছে। অধ্যক্ষ স্যার হুমকি দিয়েছেন, আমার অবসরের কাগজপত্র তাঁর সই ছাড়া হবে না।”

শিক্ষক পরিষদের কোষাধ্যক্ষ প্রভাষক জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন,“দেয়াল ভাঙা বা নির্মাণকাজের জন্য একাডেমিক কাউন্সিলের অনুমোদন নেওয়া জরুরি। কিন্তু কোনো বৈঠক হয়নি। পরে উপস্থিতির স্বাক্ষর ব্যবহার করে রেজুলেশনের কপি দেখানো হয়েছে।”

আরেক শিক্ষক এটিএম আতিকুর রহমান বলেন, “সরকার প্রতিমাসে বাড়িভাড়া দেয়। তবু অধ্যক্ষ স্যার প্রশাসনিক ভবনের পরীক্ষাকক্ষে থাকছেন, যা নিয়মবহির্ভূত। এতে পরীক্ষার সময় নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে।”

কলেজের নৈশপ্রহরী লাল মিয়া জানান,
“স্যার বুধবার রাতে বাড়িতে যান, রোববার সকালে আসেন। আগে রুমেই রান্না করতেন, এখন আমি আমার বাড়ি থেকে খাবার দিয়ে আসি।”

শিক্ষকরা বলেন, বৃহস্পতিবার অধ্যক্ষ নিয়মিত ছুটিতে থাকেন। সপ্তাহের মাঝখানেই প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।

অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. মজিবল হায়দার চৌধুরী অবশ্য অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। “কলেজের স্বার্থে আমি অনেক কষ্ট করে একটি কক্ষে থাকি,” বলেন তিনি।
“অন্য সব অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”

ছুটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন“এ বিষয়ে প্রশ্ন করার এখতিয়ার শুধু মহাপরিচালক (ডিজি) স্যারেরই আছে।”

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে—কোনো সরকারি কলেজের প্রশাসনিক বা একাডেমিক কক্ষে অধ্যক্ষসহ কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর রাত্রিযাপনের সুযোগ নেই। সরকার এর জন্য প্রত্যেক শিক্ষক ও অধ্যক্ষকে বাড়িভাড়া ভাতা প্রদান করে থাকে।

অন্যদিকে, প্রশাসনিক ভবনের কক্ষটি অধ্যক্ষের ব্যক্তিগত ব্যবহারে থাকায় পরীক্ষার সময় প্রশ্ন সংরক্ষণ, কাগজপত্র যাচাই, দায়িত্ব বণ্টন— এসব কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষকদের। তারা বলছেন, “আমরা পরীক্ষা চলাকালে রুমে ঢুকতে সংকোচ বোধ করি।”

চিলমারী সরকারি কলেজের শিক্ষক পরিষদের কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানাতে ভয় পাচ্ছেন অনেকেই।তাদের ভাষায়, “স্যার প্রভাবশালী। কেউ মুখ খুললে বদলি বা হয়রানির আশঙ্কা থাকে।”

এদিকে স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরাও বিষয়টি নিয়ে অসন্তুষ্ট। তাদের অনেকে বলছেন, কলেজের শিক্ষার পরিবেশ দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে।

স্থানীয় শিক্ষক সমাজের একাংশ মনে করছে, এই ঘটনা শুধু একটি কলেজের নয়—এটি প্রশাসনিক শৃঙ্খলার দুর্বলতারও প্রতিচ্ছবি।
তাদের মতে, “একজন অধ্যক্ষ যখন কলেজের প্রশাসনিক কক্ষকে নিজের বাসস্থানে পরিণত করতে পারেন, তখন বোঝা যায় তদারকির ঘাটতি কতটা গভীর।”

সরকারি কলেজে অধ্যক্ষদের জন্য বাসস্থান বা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকলেও, নিয়ম অনুযায়ী বিকল্প আবাসন সুবিধা হিসেবে ভাতা প্রদান করা হয়। তাই প্রশাসনিক কক্ষে রাত্রিযাপন কোনোভাবেই অনুমোদিত নয় বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

চিলমারী সরকারি ডিগ্রি কলেজটি কুড়িগ্রাম জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। অথচ সেই কলেজেই এখন প্রশাসনিক কক্ষ, শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক পরিষদের মধ্যে অবিশ্বাস ও নীরব দ্বন্দ্ব।
অধ্যক্ষ বলছেন, তিনি “কলেজের স্বার্থে” থাকছেন; অন্যদিকে শিক্ষকরা বলছেন, এটি প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও ভয়ভীতির প্রতিফলন।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কলেজ কর্তৃপক্ষের এমন আচরণ তদন্তসাপেক্ষ বলে মনে করছেন সচেতন মহল। তারা বলছেন,
“অধ্যক্ষ যদি প্রশাসনিক কক্ষেই বসবাস করেন, তবে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষা করবে কে?”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *