প্রফেসর ড. আ ব ম সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী
মেধাবীদের সুশিক্ষার পরিবেশ প্রদানে ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে ক্যাডেট কলেজের আদলে ৬০০টি সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি আসনে ছেলেদের জন্য একটি এবং মেয়েদের জন্য একটি করে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) নির্দেশনায় এই প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬৮ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা।
আবাসিক শিক্ষার গুরুত্ব ও ক্যাডেট কলেজ মডেল
বর্তমানে দেশে ৯টি বয়েজ এবং ৩টি গার্লস ক্যাডেট কলেজ রয়েছে, যার সবগুলোই সম্পূর্ণ আবাসিক। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পরীক্ষার ফলাফল বরাবরই শতভাগ সফল। প্রকৃতপক্ষে, মানসম্মত শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে আবাসিক ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। একজন শিক্ষার্থী কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করবে—এটিই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে না। তাকে একজন সুনাগরিক ও নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে আবাসিক পরিবেশ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সরকারের এই ইতিবাচক উদ্যোগটি দেশের সামগ্রিক শিক্ষাক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।
অবহেলিত ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা
বাংলাদেশে মূলত দুই ধারার শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে: সাধারণ শিক্ষা ও ইসলামি শিক্ষা। সাধারণ শিক্ষার অধীনে ৬৫ হাজার ৫০০টিরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অসংখ্য সরকারি স্কুল ও কলেজ রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সরকারি পর্যায়ে ইসলামি শিক্ষাধারায় মাত্র তিনটি মাদ্রাসা ছাড়া আর কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। দীর্ঘদিন ধরে দেশের ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এক প্রকার স্থবির অবস্থায় রয়েছে।
বর্তমান সরকার বারবার নিজেদের ইসলামি শিক্ষাবান্ধব হিসেবে ঘোষণা করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীর মুখেও বিভিন্ন সময়ে এর সপক্ষে বক্তব্য শোনা গেছে। তাই দেশ ও জাতির প্রত্যাশা—প্রস্তাবিত ৬০০ মডেল কলেজের পাশাপাশি সরকার প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে মডেল মাদ্রাসা স্থাপনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে।
আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাসমূহ:
- মডেল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা: প্রতি জেলায় ক্যাডেট কলেজের আদলে অন্তত একটি করে আধুনিক আবাসিক মডেল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হোক।
- এবতেদায়ী মাদ্রাসা জাতীয়করণ: দেশের সকল এবতেদায়ী মাদ্রাসাকে অতি দ্রুত জাতীয়করণ করা হোক।
- প্রতিষ্ঠান সরকারি করা: দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে কামিল মাদ্রাসা এবং প্রতিটি উপজেলায় একটি করে দাখিল, আলিম ও ফাজিল মাদ্রাসা সরকারি ঘোষণা করা হোক।
নৈতিক শিক্ষার সংকট ও করণীয়
আমাদের দেশের সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যেভাবে নৈতিক শিক্ষার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন ছিল, বাস্তবে তা অনুপস্থিত। আর এই নৈতিক স্খলনের কারণেই দেশের শীর্ষ পদে আসীন অনেকের বিরুদ্ধেই দুর্নীতি ও দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগ উঠছে।
বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্ম শিক্ষার জন্য নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষক নেই। মাধ্যমিক পর্যায়ে ইসলাম শিক্ষা বিষয়টি নামমাত্র ও ঐচ্ছিক হিসেবে রাখা হয়েছে। অধিকাংশ সরকারি কলেজ এবং দেশের ৫৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহভাগেই ইসলামি শিক্ষার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি বিগত দেড় দশকে সাধারণ কলেজগুলোতে নতুন কোনো ইসলামি শিক্ষা বিভাগ খুলতে দেওয়া হয়নি।
উপসংহার
বর্তমান সরকার যেমন ইসলামি শিক্ষাবান্ধব হিসেবে পরিচিত, তেমনই বর্তমান সংসদে বিরোধী দলেও দেশের একটি বৃহৎ ইসলামি সংগঠনের সংসদ সদস্যগণ প্রতিনিধিত্ব করছেন। এমতাবস্থায়, সাধারণ স্কুল-কলেজে ইসলামি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং মাদ্রাসা শিক্ষাকে জাতীয়করণ করতে না পারা সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের জন্যই একটি বড় ব্যর্থতা হিসেবে গণ্য হবে।
দেশের ৯০ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও নৈতিক অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সরকার অতি দ্রুত এই দাবিগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে—এটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।
লেখক: সাবেক ডিন, থিওলজী অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
