
|| নিজস্ব প্রতিবেদক ||
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে পদায়িত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার এবং সচিবালয়ের কার্যক্রম কার্যত বাতিল করার সরকারি পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকারের এই সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। আজ বুধবার (২০ মে) বিকেলে গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে দলটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এই প্রতিবাদ জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বাধীন, কার্যকর ও নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত বিচারব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছে। মূলত অধস্তন আদালতের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ, পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কার্যাবলিকে নির্বাহী বিভাগের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতেই সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার ওপর সরাসরি বড় ধরনের আঘাত। বিচার বিভাগকে যদি তার নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো, প্রয়োজনীয় জনবল ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা থেকে এভাবে বঞ্চিত করা হয়, তবে সংবিধানে ঘোষিত স্বাধীন বিচার বিভাগের মূল চেতনা কেবল কাগুজে ঘোষণায় পরিণত হবে।
এনসিপি নেতৃবৃন্দ বলেন, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের অধীন প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ রাখা ন্যায়বিচার, আইনের শাসন এবং সাধারণ নাগরিক অধিকার সুরক্ষার জন্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিকর। আদালত যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তবে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলটি দুর্বল হয়ে পড়ে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
নেতৃবৃন্দ স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেন, যে কোনো সরকারই যদি বিচার বিভাগের ওপর নিজেদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করে, তবে তা গণতন্ত্র, দেশের সংবিধান এবং জুলাই গণআকাঙ্ক্ষার সাথে স্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা। বিশেষ করে বিএনপি নিজেদের ঘোষিত ৩১ দফার ওয়াদার বরখেলাপ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করলে তা দেশের জনগণ কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ছিল মূলত বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতার দিকে একটি অন্যতম মাইলফলক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ। সেটিকে বিলুপ্ত বা অকার্যকর করার পরিবর্তে আরও বেশি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। কারণ একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ ছাড়া কখনো সুস্থ গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না, সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না এবং রাষ্ট্রের কোনো সংস্কারই অর্থবহ রূপ পায় না।
উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি ৪ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে:
১. সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে পদায়িত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল ও পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
২. স্বাধীন বিচার বিভাগ নিশ্চিত করতে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয়কে দ্রুত কার্যকর, স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দিতে হবে।
৩. বিচারকদের পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলাজনিত যাবতীয় বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের পরোক্ষ প্রভাব সম্পূর্ণ দূর করতে হবে।
৪. প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
নেতৃবৃন্দ সাফ জানিয়ে দেন, এনসিপি সর্বদা জনগণের অধিকার, সংবিধান, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের পক্ষে আপসহীন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে নেওয়া যে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক, আইনগত ও গণতান্ত্রিকভাবে রাজপথে শক্ত প্রতিবাদ অব্যাহত রাখবে দলটি।
