|| প্রফেসর ড. আ ব ম সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী ||
সম্মানীকে সম্মান না দেওয়া হয়তো অপরাধ নয়, কিন্তু সম্মান দিয়ে তা কেড়ে নেওয়া চরম অবমাননাকর। অতি সম্প্রতি দেশের চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহর ইমেরিটাস পদটি প্রত্যাহারের ঘটনা প্রসঙ্গে এই বেদনাবোধ থেকেই কিছু কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি।
গত ২৪ জুন ২০২৬ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এক অফিস আদেশের (স্মারক নং- বিএমইউ/২০২৬/৬২৮৮) মাধ্যমে তাঁর ইমেরিটাস অধ্যাপক পদটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। শুধু পদ প্রত্যাহারই নয়, চিঠিতে কারণ উল্লেখপূর্বক তাকে দেওয়া আর্থিক সম্মানীও ফেরত চাওয়া হয়েছে। চিঠির ভাষ্যমতে— বিগত ২০ জুন ২০২৪ তারিখে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ৯২তম সভায় আলোচ্যসূচির বাইরে গিয়ে এক সদস্যের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ অধ্যাদেশ সংশোধন করে অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহকে আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। একই সিন্ডিকেটে অধ্যাদেশ সংশোধন ও নিয়োগ অনুমোদন করা বিধি-বহির্ভূত হওয়ায়, গত ১৩ জুন ২০২৬ তারিখের ৯৯তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেই নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে এবং উত্তোলিত বেতন-ভাতাদি ফেরতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে এই প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তটি আমার বিবেককে গভীরভাবে তাড়িত করেছে। বিষয়টি কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় অনুধাবন করা প্রয়োজন— সিন্ডিকেট কোনো ব্যক্তিবিশেষ নয়, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পর্ষদ। আর দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। যদি এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো পদ্ধতিগত ত্রুটি বা অনিয়ম হয়ে থাকে, তবে তার দায় সম্পূর্ণভাবে সিন্ডিকেটের, ডা. আব্দুল্লাহর নয়। অথচ সিন্ডিকেটের প্রাতিষ্ঠানিক ভুলের বলি হতে হলো একজন প্রখ্যাত শিক্ষক ও চিকিৎসককে। শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে ‘ইমেরিটাস অধ্যাপক’ পদটি সর্বোচ্চ মর্যাদাকর। একজন প্রফেসরের এই অবমাননা কেবল ব্যক্তি ডা. আব্দুল্লাহর নয়, বরং এটি দেশের চিকিৎসা শিক্ষা তথা সমগ্র উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই এক লজ্জাজনক দৃষ্টান্ত। এই সিদ্ধান্তের বলির পাঁঠা ডা. আব্দুল্লাহ কেন হবেন? দায় যদি নিতেই হয়, তবে তৎকালীন সিন্ডিকেট সদস্যদের নেওয়া উচিত, কারণ সিদ্ধান্তটি তাদের হাত দিয়েই এসেছিল।
ছাত্রজীবন থেকে ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহকে যতটুকু চেনার সুযোগ হয়েছে, তিনি এক অত্যন্ত সাধারণ ও সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত ব্যক্তিত্ব। পেশাগত দায়িত্বের বাইরে জাঁকজমকপূর্ণ জীবন বা কোনো রকম অন্যায্য তদবিরে লিপ্ত হতে তাকে কখনো দেখা যায়নি। চিকিৎসক হিসেবে তিনি সবসময় নিজের কর্তব্যের চেয়েও বেশি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বর্তমান সময়ে যেখানে সাধারণ চিকিৎসকদেরও ভিজিট হাজার টাকার নিচে নয়, সেখানে দেশের অন্যতম শীর্ষ এই চিকিৎসকের পরামর্শ ফি মাত্র ৩০০ টাকা। তাঁর মেধা ও খ্যাতির তুলনায় যা তিন হাজার টাকা হওয়াও অস্বাভাবিক ছিল না।
চিকিৎসা শাস্ত্রে তাঁর অবদান কেবল রোগী দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওপর তিনি অনন্য ১০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার মধ্যে ৭টিই প্রকাশিত হয়েছে লন্ডন থেকে এবং বিশ্বের বহু স্বনামধন্য মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যবই হিসেবে সেগুলো পড়ানো হয়। তিনি যদি লবিং বা তদবিরের মাধ্যমে পদ পাওয়ার কাঙ্ক্ষিত হতেন, তবে অনেক আগেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) হতে পারতেন। ডা. আব্দুল্লাহ আজ কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন, তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। কারো পেছনে ঘুরে বা অনুকম্পা নিয়ে তিনি ইমেরিটাস অধ্যাপক হননি।
প্রবাদ আছে, ‘হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না’। প্রশাসনিক বা আইনি কোনো ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ সবসময়ই থাকে। সদিচ্ছা থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই পেছনের তারিখ থেকেই ত্রুটি সংশোধনপূর্বক তাকে এই পদে বহাল রাখতে পারত।
ডা. আব্দুল্লাহ দেশ ও জাতির জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছেন। রাষ্ট্র ও সমাজ তাকে মূল্যায়ন করেছে— তিনি ইতিমধ্যে ১৫টি সম্মানজনক পদক ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। কাজেই, ইমেরিটাস পদের আর্থিক সুবিধা বা সামাজিক মর্যাদা তাঁর মতো একজন মানুষের প্রাপ্তির খতিয়ানকে নতুন করে সমৃদ্ধ বা খর্ব করে না। বরং এই যোগ্য মানুষকে সম্মান জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই ধন্য হয়েছিল। আমার জানা মতে, তিনিই সম্ভবত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ইমেরিটাস অধ্যাপক।
কারণ যাই হোক না কেন, এই পদ প্রত্যাহারে ডা. আব্দুল্লাহর মতো ব্যক্তিত্বের ব্যক্তিগত অর্জনে কিছুই আসে যায় না। তবে এই ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা গণমাধ্যমে তাঁর খেদোক্তি প্রকাশ বা সাক্ষাৎকার দেওয়াটা আমার দৃষ্টিতে তাঁর মর্যাদাকে কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ণ করেছে। তাঁর মতো ব্যক্তিত্বের উচিত ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নির্দেশনার পর কোনো প্রকার আপিল বা আবেদনের ধার না ধেরে, প্রয়োজনে নিজের সবকিছু বিক্রি করে হলেও সমুদয় অর্থ অবিলম্বে ফেরত দিয়ে দেওয়া। কারণ, প্রকৃত গুণী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ সম্মান বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পারেন, অর্থ তো সেখানে অত্যন্ত তুচ্ছ বিষয়।
পরিশেষে কিছু চিরন্তন সত্য মনে করিয়ে দেওয়া আবশ্যক:
- যে দেশে গুণীর কদর হয় না, সে দেশে গুণী জন্মায় না।
- একজন প্রকৃত কর্মীর কাজের মূল্যায়ন কোনো পরিমাপক স্কেল বা বাটখারা দিয়ে সম্ভব নয়।
- গুণীদের সম্মান জানালে গুণীর চেয়ে সম্মানকারীদের মর্যাদা ও গৌরবই বেশি বৃদ্ধি পায়।
- গুণী মানুষ বেঁচে থাকেন তাঁর মৃত্যুর পরও, তাঁর কালজয়ী কর্মের মাঝে।
- গুণীর কদর বটবৃক্ষের মতো বিশাল। সেই বৃক্ষের দু-একটি পাতা যদি পাখির বিষ্ঠায় নষ্টও হয়, তাতে বটবৃক্ষের মহিমা বিন্দুমাত্র কমে না।
যাঁরা সত্যিকার অর্থে দেশ ও জাতির জন্য কাজ করেন, তাঁরা কোনো বৈষয়িক প্রাপ্তির আশায় কাজ করেন না; তাঁরা কাজ করেন সমাজকে কিছু দেওয়ার তাগিদ থেকে। প্রাতিষ্ঠানিক সংকীর্ণতা যেন আমাদের এই মহান গুণীদের অবমূল্যায়নের পথ প্রশস্ত না করে।
লেখক: সাবেক ডিন, থিওলজী অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।
