
জালিয়াতি আর অবহেলার শিকার মানিকগঞ্জের যমুনার দুর্গম চরের শিশুরা
|| সেলিম মোল্লা | নিজস্ব প্রতিনিধি (মানিকগঞ্জ) ||
মাতৃত্বকালীন ছুটির নামে জালিয়াতি— শিক্ষার নামে প্রহসন! নিশ্চুপ প্রশাসন— বাঘুটিয়ার চরে শিক্ষার হাহাকার!
যমুনা নদী বেষ্টিত মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার দুর্গম বাঘুটিয়া চরাঞ্চল। উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরত্বের এই জনপদে যমুনার ঢেউয়ের চেয়েও উত্তাল হয়ে উঠেছে শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে থাকার কথা থাকলেও, বছরের পর বছর শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত। চরের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক উপস্থিতি এখন কেবল খাতা-কলমে; বাস্তবে কোথাও পাঠদান করছে দপ্তরি, কোথাও অভিভাবক, আবার কোথাও প্রক্সি শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, যমুনার এ চরাঞ্চলের ৪২ নম্বর রংদারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫৪ নম্বর চর কালিকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৫ নম্বর বাঘুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে কোনো শিক্ষক নেই। দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে পাঠদান না হওয়ায় ব্ল্যাকবোর্ড ও শিক্ষার্থীদের বেঞ্চে ময়লার আস্তরণ জমে গেছে। শিক্ষকদের অনুপস্থিতিতে কোমলমতি শিশুরা আড্ডা আর গল্পে সময় পার করছে।
এসময়, সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে দু-একজন শিক্ষক দুপুরে তড়িঘড়ি করে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন এবং নানা অজুহাত দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন।
সাংবাদিক আসার খবরে দ্রুত উপস্থিত হওয়া ৪২ নং রংদারপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুলাইমান হোসেন দোষ স্বীকার করে বলেন, বিদ্যালয়ে দেড়িতে আসা শিক্ষার জন্য ক্ষতি। দেড়িতে বিদ্যালয়ে এলে ক্লাস কিভাবে পরিচালনা করা হয় জানতে চাইলে তিনি জানান, এ সময়ে শিক্ষকের পরিবর্তে বিদ্যালয়ের দপ্তরিই ক্লাস নেন শিক্ষার্থীদের।
সাংবাদিক আসার খবরে দুপুর বেলা তড়িঘড়ি করে আসা একই বিদ্যালয়ের জেয়াসমিন সুলতানা নামের এক শিক্ষিকা বলেন, আমার পরিচয় কি দিতেই হবে? এসময় যথাসময়ে বিদ্যালয়ে না আসার ব্যাপারে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার বাবুটা অসুস্থ হওয়ায় আজকে দেরি হয়েছে। প্রতিদিনই আসার চেষ্টা করি।
একই বিদ্যালয়ের যথাসময়ে না আসা আমিনুল ইসলাম নামের শিক্ষক বলেন, ১০টার পরে বিদ্যালয়ে আসার বিষয়টি এমপি, ইউএনও, শিক্ষা অফিসারসহ সকলেই জানেন। এসময় তিনি নদীতে আসতে দেরি হয় বলে বাহানা জুড়ে দেন।
এদিকে, অনিয়মের সকল কথা অকপটে স্বীকার করেছেন বিদ্যালয়ের দপ্তরি ও অভিভাবকরা। দপ্তরিদের ভাষ্যমতে, প্রধান শিক্ষকরা মাঝেমধ্যে চা খাওয়ার অজুহাতে বের হয়ে আর ফেরেন না, আর শিক্ষিকারা সুযোগ পেলেই ঘুরতে চলে যান।
অনুসন্ধানে চর কালিকাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকার অবিশ্বাস্য জালিয়াতির তথ্য উঠে এসেছে।
জানা গেছে, আবিদা সুলতানা নামের এক শিক্ষিকা অবৈধভাবে মাতৃত্বকালীন ছুটি উপভোগ করছেন। সরকারি বিধি অনুযায়ী দুই সন্তানের জন্য এই ছুটির বিধান থাকলেও এটি তার চতুর্থ সন্তান। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, তার চতুর্থ সন্তানটি জন্মই নেয়নি, বরং গর্ভেই নষ্ট হয়ে গেছে। এই ভয়াবহ মিথ্যা তথ্য ও জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি ছুটি কাটিয়ে সরকারি সুবিধা নিচ্ছেন।
অন্যদিকে, নুরজাহান আক্তার নামের আরেক শিক্ষিকা স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করেন। তিনি মাসে হাতেগোনা কয়েকদিন এসে নামে ক্লাস করান এবং কেবল বেতন উত্তোলন করে নিয়ে যান।
সরেজমিন বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে গিয়ে প্রধান শিক্ষককে পাওয়া যায়নি। এসময় একজন প্রক্সি শিক্ষককে ক্লাস নিতে দেখা যায় যিনি ধামরাইয়ের একটি মাদ্রাসায় ফাজিল ১ম বর্ষে অধ্যয়ন করছেন।
তবে, কিছুক্ষন অবস্থানের পর বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মোটরসাইকেল যোগে বিদ্যালয়ে আসেন এবং অসুস্থ থাকায় তার ঔষধ আনতে গিয়েছিলেন জানিয়ে তিনি যথাসময়েই বিদ্যালয়ে এসেছেন বলে নিশ্চিত করেন।
বিদ্যালয়টির (চর কালিকাপুর) প্রধান শিক্ষক মানোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের যাতায়াতে অনেক সমস্যা হওয়ায় ও দুর্গম অঞ্চল হওয়ায় মাঝেমধ্যে দেড়ি হয়। নদীপথে অন্য এলাকা থেকে আসতে অনেক সময় নৌকা না থাকায় দেড়ি হয়। আসতে যতটুকু সময় লাগে, এছাড়া দেরি হয় না আমার।
এসময়, বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অনুপস্থিতির বিষয়টি তিনি নিশ্চিত করেন।
এদিকে বিদ্যালয়টির দপ্তরি সাংবাদিকদের উপস্থিতি নিয়ে অসহযোগিতামূলক আচরণ করে স্থানীয় কতিপয় সন্ত্রাসীদের ফোন দিয়ে বিদ্যালয়ে এনে সংবাদ সংগ্রহে বাধা প্রদানের চেষ্টা করেন।
স্থানীয়দের মন্তব্য, প্রশাসনের তদারকির অভাবে এই শিক্ষক-কর্মচারীরা যেন ‘অঘোষিত সম্রাট’ হয়ে উঠেছেন।
শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত টিফিনেও এ অঞ্চলে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। জানা গেছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের রুটি ও ডিম দেওয়ার কথা থাকলেও এ অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে কেবল রুটি দিয়ে ডিমের বরাদ্দ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। বিস্কুট ও দুধ দেওয়ার কথা থাকলে একটি দিয়ে অপরটির অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে।
এসময় শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত টিফিন মাঝেমধ্যেই পাননা বলে অভিযোগ করেন বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, বছরের পর বছর এই অনিয়ম চললেও জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তাদের ভূমিকা রহস্যজনক। চরের শিক্ষকদের জন্য যমুনা পাড়াপাড়ের বিশেষ ব্যবস্থা থাকলেও তারা বিদ্যালয়ে যান না। অথচ শিক্ষা অফিসাররা অফিসে বসে শিক্ষকদের পক্ষেই সাফাই গাইতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের আক্ষেপ, অনিয়মের পাহাড় জমলেও এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ ব্যাপারে বাঘুটিয়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন বলেন, শিক্ষকদেরকে আমরা টাইম টু টাইম আনতে পারতেছি না। এ ব্যাপারে ইউএনও, শিক্ষা অফিসারসহ সকলকে জানানো হয়েছে। বিষয়টির অতি তাড়াতাড়ি সুরাহা হওয়া প্রয়োজন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার গোকুল চন্দ্র দেবনাথ বলেন, “অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মিটিংয়ে শিক্ষকদের উপস্থিত থাকার বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশ অমান্যকারীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ফারজানা প্রিয়াঙ্কা বলেন, “শিক্ষকরা যদি নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থাকেন, তাহলে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সবশেষ, প্রশাসন, শিক্ষা অফিসার ও শিক্ষকদের এই কথিত ‘অবৈধ সিন্ডিকেট’ কি আদৌ ভাঙবে? না-কি এভাবেই মৌলিক অধিকার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে দুর্গম চরাঞ্চলের কয়েক হাজার কোমলমতি শিশু?
যমুনার ভাঙনের মতো এ চরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থাও এখন বিলীন হওয়ার পথে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে দ্রুত বিশেষ অভিযান ও তদন্ত পরিচালনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
