
|| আব্দুর রহমান জামী ||
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে সংঘটিত সেই রক্তাক্ত ঘটনার ১৩ বছর পূর্তি আজ। দীর্ঘ এক যুগ পেরিয়ে গেলেও ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ সত্য উদঘাটন, হতাহতদের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নির্ধারণ এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এই অনিরসনীয় বাস্তবতা জাতির বিবেককে আজও নাড়া দেয় এবং ইতিহাসের এক বেদনাবিধুর অধ্যায় হিসেবে শাপলা চত্বরের সেই রাত ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তাকে আরও গভীরভাবে সামনে নিয়ে আসে।
সেই রাতের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে রয়েছে অসংখ্য প্রশ্ন এবং ভিন্নমুখী বিশ্লেষণ। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, বিভিন্ন মহলের বক্তব্য এবং তৎকালীন পরিস্থিতি মিলিয়ে এটি কেবল একটি ঘটনা নয়; বরং দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল হিসেবে বিবেচিত হয়। কী ঘটেছিল, কতজন প্রাণ হারিয়েছেন, কারা নিখোঁজ হয়েছেন—এসব প্রশ্ন আজও স্পষ্ট ও সর্বজনগ্রহণযোগ্যভাবে উত্তর পায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দৃঢ় হয় তখনই, যখন সে রাষ্ট্র ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আপসহীন থাকে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে শাপলা চত্বরের ঘটনার একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী তদন্ত সময়ের অপরিহার্য দাবি। একইসঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘ প্রতীক্ষা, বেদনা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। শহীদ ও আহতদের পরিবারগুলোর জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন, চিকিৎসা সহায়তা, শিক্ষা ও জীবিকার নিশ্চয়তা প্রদান—এসব উদ্যোগ এখন আর বিলম্বের সুযোগ রাখে না।
এ প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি বিশেষভাবে আহ্বান জানানো হচ্ছে—যাতে তারা শহীদ পরিবারের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়, একটি সুসংগঠিত সহায়তা তহবিল গঠন করে, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের কার্যক্রম জোরদার করে এবং দীর্ঘদিন ধরে কষ্টে থাকা পরিবারগুলোর পাশে মানবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা নিশ্চিত করে। একইসঙ্গে, এই ঘটনার সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ, দলিলভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরার ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
শাহবাগিদের আন্দোলনের কারণে দেশের ইসলাম ও সামাজিক স্থিতিশীলতা চরম সংকটের মুখে পড়েছিল এবং শাহবাগের নাস্তিক্যবাদের উত্থানে হেফাজতের আন্দোলন বা শাপলা চত্বরের ঘটনা না ঘটলে দেশের অস্তিত্ব সংকটে পড়ত।
১৩ বছর পরও শাপলা চত্বরের সেই রাত বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভারী, স্পর্শকাতর এবং অমোচনীয় অধ্যায় হয়ে রয়েছে। এই অধ্যায়ের পূর্ণ সত্য উদঘাটন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ভুক্তভোগীদের অধিকার নিশ্চিত করা শুধু অতীতের দায় নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্যও একটি অপরিহার্য ভিত্তি। কারণ, সত্য চাপা পড়ে থাকলে আস্থার সংকট তৈরি হয়, আর বিচারহীনতা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। তাই এই ঘটনার সকল দায়ীদের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ বিচার নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ।
