বৃহস্পতিবার, জুলাই ২

বাঁশখালীতে আওয়ামী লীগপন্থী সাংবাদিক শফকতের বিরুদ্ধে জাল দলিল তৈরির মামলা!

|| চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ||

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পৈতৃক সম্পত্তি দখল, জাল খতিয়ান ও কাগজপত্র তৈরি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রতারণার অভিযোগে স্থানীয় এক সাংবাদিকসহ আটজনের বিরুদ্ধে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের হয়েছে। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে আদালত মামলাটি আমলে গ্রহণ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), চট্টগ্রাম জেলা ইউনিটকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলমান জমি-সংক্রান্ত বিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বুধবার (১ জুলাই) দুপুরে বাঁশখালী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বৈলছড়ি ইউনিয়নের চেচুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা ছলিমা বেগমের পক্ষে আমমোক্তার সাঈদ নুর সিদ্দিক মামলাটি দায়ের করেন। শুনানি শেষে বিচারক আবদুল হামিদ অভিযোগের প্রাথমিক ভিত্তি বিবেচনায় নিয়ে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন।

মামলায় ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের ৪(১)(ক)(২), ৭(২)(৩) এবং দণ্ডবিধির ৫০৬(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে জমির মালিকানা দাবি, প্রকৃত মালিককে উচ্ছেদের চেষ্টা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রাণনাশের হুমকি।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বাদী ছলিমা বেগম ও তাঁর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে পৈতৃক ও ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া জমি শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখলে ছিলেন। কিন্তু অভিযুক্তরা পরিকল্পিতভাবে ওই জমির ওপর মালিকানা দাবি করে বিভিন্ন সময়ে জাল বিএস খতিয়ান ও অন্যান্য দলিলপত্র ব্যবহার করে দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। শুধু তাই নয়, আদালত ও প্রশাসনের কাছেও বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে প্রকৃত মালিকদের অধিকার খর্ব করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্তদের মধ্যে প্রধান আসামি শফকত হোসাইন চাটগামী স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তাঁর নেতৃত্বে সংঘবদ্ধভাবে জমি দখলের চেষ্টা, ভুক্তভোগীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বাদীপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবাদ করলে লাঠিসোঁটা ও লোহার রড নিয়ে হামলার ভয় দেখানো হয় এবং প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। ফলে পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করছে।

মামলার আসামিরা হলেন, গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা গ্রামের মৃত রৌশন আলীর ছেলে শফকত হোসাইন চাটগামী (৪৫), জঙ্গল জলদী আমিরাঘোনা এলাকার মৃত মো. ফরিদের ছেলে নজরুল ইসলাম (৩৫), বদি আহমদের ছেলে মোহাম্মদ ইসলাম (৪২), মৃত খলিলুর রহমানের স্ত্রী ফরিদা খানম (৫০), তাঁর ছেলে ছমিদুল হক (৩২), মৃত ফরিদের স্ত্রী জাহানারা বেগম (৫০), মৃত বদিউর রহমানের ছেলে নন্না মিয়া (৪৮) এবং মৃত এজাহার মিয়ার ছেলে তৈয়ব মিয়া (৪৮)।

বাদীপক্ষের দাবি, এটি কোনো সাধারণ জমি বিরোধ নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে জাল দলিল ও খতিয়ান ব্যবহার করে প্রকৃত মালিকদের সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা। এ কারণে আদালতের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের আবেদন জানানো হয়েছে।

আইনজীবী সাদমান মেহজাবিন বলেন, দীর্ঘ শুনানির পর আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পথ সুগম হবে।

এদিকে মামলার প্রধান আসামি শফকত হোসাইন চাটগামী বর্তমানে দৈনিক খবরের কাগজ ও দৈনিক সাঙ্গু পত্রিকার বাঁশখালী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শফকত হোসাইন চাটগামী। তিনি বলেন, “এমপি মোস্তাফিজের আমল থেকে আমাদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা-হামলা হয়ে আসছে, এটি তারই ধারাবাহিকতা। এসব ভূয়া ও হাস্যকর মামলায় আমাদের কিছুই হবে না। বরং যাদের কাছ থেকে আমি মসজিদের জন্য ক্রয় করা জমির দখল পাওয়ার কথা, তারাই আমাকে এক নম্বর আসামি করেছে। শুধু আমাকে নয়, গ্রামের আরও অনেক নিরীহ মানুষকে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে। এলাকাবাসী ঐক্যবদ্ধভাবে এই মামলা মোকাবিলা করবে। অতীতেও হাইকোর্টসহ বিভিন্ন আদালতে আমরা আইনি লড়াইয়ে সফল হয়েছি। এবারও সত্যের জয় হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

এদিকে আদালতের নির্দেশে এখন পিবিআইয়ের তদন্তের দিকে নজর সংশ্লিষ্ট সবার। তদন্তে জাল খতিয়ান, জমির প্রকৃত মালিকানা, দখল সংক্রান্ত দাবি, আদালতে উপস্থাপিত নথির বৈধতা এবং উভয় পক্ষের অভিযোগ-প্রতিঅভিযোগ যাচাই করা হবে। তদন্ত শেষে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে জাল দলিল, জাল খতিয়ান ও প্রভাব খাটিয়ে জমি দখলের অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। আইনজীবীদের মতে, এসব ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে প্রকৃত ভূমির মালিকদের অধিকার রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে। সেই প্রেক্ষাপটে বাঁশখালীর এই মামলাটিও স্থানীয়ভাবে ব্যাপক গুরুত্ব বহন করছে এবং তদন্তের ফলাফলের দিকে নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *