বুধবার, মে ২০

পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয় ও রেকর্ডের মহোৎসব

|| স্পোর্টস ডেস্ক ||

বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে এক অবিশ্বাস্য ও অভূতপূর্ব আধিপত্যের নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। দুই দেশের মধ্যকার মুখোমুখি লড়াইয়ে দুই সিরিজ মিলিয়ে টানা চারটি ম্যাচেই জয় ছিনিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে রাওয়ালপিন্ডিতে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ২-০ ব্যবধানে ঐতিহাসিক হোয়াইটওয়াশ করার পর, এবার নিজেদের ঘরের মাঠেও ঠিক একই ফলাফলের পুনরাবৃত্তি ঘটাল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।

ক্রিকেট ইতিহাসে এই অবিস্মরণীয় সাফল্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্বিতীয় দল হিসেবে পাকিস্তানকে টানা দুই বা ততোধিক ম্যাচের টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করার গৌরবময় কৃতিত্ব অর্জন করল। এর আগে কেবল পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়া ১৯৯৯ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত টানা চার সিরিজে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করতে পেরেছিল। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছেছে প্রথম দল হিসেবে পাকিস্তানকে টানা সিরিজে দুই বা ততোধিক ম্যাচে হোয়াইটওয়াশের স্বাদ আনিয়ে। এর আগে ২০১৩-২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টানা চারটি টেস্ট জয়ের ঘটনা ছিল বাংলাদেশের আগের সর্বোচ্চ ধারাবাহিকতা, যা এবার তারা ছাড়িয়ে গেল।

একই সাথে এটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসেও প্রথমবারের মতো টানা চারটি ম্যাচ জয়ের এক অনন্য রেকর্ড। এর আগে গত বছরের নভেম্বর মাসে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে টানা দুই জয় ছিল তাদের সাফল্যের অন্যতম ধারাবাহিকতা। এখন ঘরের মাঠে টানা পাঁচটি টেস্ট জয়ের মধ্য দিয়ে দেশের মাটিতে নিজেদের সেরা রেকর্ডও নতুন করে লিখল বাংলাদেশ।

অন্যদিকে এই সিরিজটি পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসের জন্য এক ভয়াবহ ও অন্ধকার পরিসংখ্যান তৈরি করেছে। তারা নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে বিদেশের মাটিতে টানা সাতটি অ্যাওয়ে টেস্টে পরাজিত হয়েছে, যা তাদের যৌথভাবে সবচেয়ে খারাপ রেকর্ড। এর আগে ২০১৮ থেকে ২০২০ সালেও তারা টানা সাত অ্যাওয়ে ম্যাচে হেরেছিল। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে পাকিস্তান এখনো বিদেশের মাটিতে কোনো টেস্ট ম্যাচের মুখ দেখেনি। বিদেশের মাটিতে তাদের সর্বশেষ জয়টি এসেছিল ২০২৩ সালের জুলাই মাসে শ্রীলংকার বিপক্ষে।

চলমান সিরিজে টস জিতে প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েও পাকিস্তান দুটি ম্যাচেই হেরেছে, যা তাদের ক্রিকেট ইতিহাসে এবারই প্রথম ঘটল। সামগ্রিকভাবে পুরো টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এটি মাত্র ষষ্ঠবারের মতো ঘটনা যেখানে কোনো দল দুই ম্যাচের সিরিজে টস জিতে প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত নিয়েও দুটি ম্যাচেই পরাজয় বরণ করেছে। অপরদিকে বাংলাদেশ প্রথমে ব্যাটিংয়ে নেমে জয়ের অভিজ্ঞতা পেয়েছে খুব কম, এটি ছিল প্রথমে ব্যাটিং করে বাংলাদেশের মাত্র তৃতীয় জয়। এর আগে ২০১৩ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এবং ২০২৩ সালে আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথমে ব্যাটিং করে জিতেছিল তারা।

পাকিস্তানের অধিনায়ক শান মাসুদের জন্য এই সিরিজটি ছিল চরম হতাশার। অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ১৬টি টেস্ট ম্যাচে এটি তার ১২তম পরাজয়, যা পাকিস্তানের অধিনায়কদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হারের রেকর্ড। শুধু তাই নয়, বিশ্ব ক্রিকেটেও প্রথম ১৬ টেস্টে এত বেশি হার পাওয়া অধিনায়কদের তালিকায় তিনি দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছেন। বিপরীতে বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত এখন দেশের সফলতম টেস্ট অধিনায়ক। অধিনায়ক হিসেবে তিনি ৮টি টেস্ট জয়ের মালিক হয়েছেন, যা বাংলাদেশের অধিনায়কদের মধ্যে এখন সর্বোচ্চ। পাশাপাশি ঘরের মাঠে তার অধিনায়কত্বে আসা ৬টি জয়ও দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

ব্যক্তিগত রেকর্ডের খাতায় বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাও চমৎকার উজ্জ্বলতা দেখিয়েছেন। তারকা ব্যাটার লিটন দাস টেস্টে তিনবার এক ইনিংসে সেঞ্চুরি ও ফিফটি করার কীর্তি গড়েছেন। বাংলাদেশের ব্যাটারদের মধ্যে তিনবার এই অর্জন রয়েছে কেবল শান্ত ও তামিম ইকবালের। তবে লিটনের এই তিনটি ঘটনাই এসেছে ছয় বা তার নিচের ব্যাটিং পজিশনে খেলার সময় এবং প্রতিবারই তিনি উইকেটকিপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

এদিকে অভিজ্ঞ ব্যাটার মুশফিকুর রহিম এখন টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ১৪টি সেঞ্চুরির অনন্য মালিক বনে গেছেন। এই অর্জনের মাধ্যমে তিনি মুমিনুল হকের ১৩টি সেঞ্চুরির রেকর্ডকে টপকে এককভাবে শীর্ষে আরোহণ করলেন। এছাড়া লিটন দাস ও মুশফিকুর রহিমের মধ্যকার জুটিও বিশ্বমঞ্চে আলো ছড়াচ্ছে। টেস্ট ক্রিকেটে পঞ্চম উইকেট বা তার নিচের পজিশনে এই দুজনের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৭টি সেঞ্চুরি জুটি সম্পন্ন হয়েছে, যা বর্তমান বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ও সফলতম রেকর্ডগুলোর একটি হিসেবে গণ্য হচ্ছে। সব মিলিয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে এই সিরিজ জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এক নতুন মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *