সোমবার, এপ্রিল ২৭

বগুড়ায় গুরুকে হত্যার পরিকল্পনা ফাঁস, শিষ্য রকি প্রকাশ্যে খুন

|| মোস্তফা আল মাসুদ | বগুড়া প্রতিনিধি ||

বগুড়া শহরতলির বনানী ও আশপাশ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী চক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জের ধরেই দিনদুপুরে প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন করা হয় হাবিবুর রহমান রকিকে (২৮)। গত বৃহস্পতিবার বেলা দেড়টার দিকে বনানী কাস্টমস অফিসের সামনে মহাসড়কে খুনের ঘটনা ঘটে। নিহত রকি বগুড়া সদর ও শাজাহানপুর থানা-পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ছিলেন। তাঁর নামে ডাকাতি, ছিনতাই, মারামারিসহ ১০ মামলা রয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সন্ত্রাসী চক্রের গুরুকে হত্যার পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় শিষ্য হাবিবুর রহমান রকিকে পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রধান আসামি ও নিহত রকির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের গুরু হারুনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে বগুড়া শহরতলির বনানী, ফুলদীঘি, বেজোড়া, গণ্ডগ্রামসহ আশপাশের এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন কাঠমিস্ত্রি পরিচয়ের আড়ালে সক্রিয় সন্ত্রাসী হারুন। হারুন স্থানীয় যুবদল নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে তোলেন একটি সংঘবদ্ধ চক্র, যেখানে রকি এবং শহর যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক বাপ্পী ঘনিষ্ঠ সহযোগী বা ‘শিষ্য’ হিসেবে যুক্ত হন হারুনের সঙ্গে।

হারুনের নেতৃত্বাধীন গ্রুপটি প্রথমে ফুটপাত দখল করে দোকান বসিয়ে ভাড়া আদায়, পরে ইট-বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং ক্রমে নিয়মিত চাঁদাবাজির মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অল্প সময়ে চক্রটি এলাকায় ভয়ভীতি সৃষ্টি করে একক আধিপত্য কায়েম করে।

তবে এক বছরের মাথায় চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে সন্ত্রাসী চক্রের ভেতরে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এর জেরে গত বছরের এপ্রিলে রকি নিজ গ্রুপের সদস্য বাপ্পীকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেন। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাপ্পী রকির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং হারুনও বাপ্পীর পক্ষ নেন। এতে রকি কার্যত একা হয়ে পড়েন এবং ত্রিমুখী দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে।

সূত্র জানায়, এই অবস্থায় রকি মাহমুদ তাঁর সন্ত্রাসী গুরু হারুনকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে হামলার চেষ্টা করলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে হারুনের ভগ্নিপতি ফজলুর রহমান আহত হন। এই ঘটনার পর হারুন আরও সতর্ক হয়ে ওঠেন এবং কৌশল পাল্টান।

পরিস্থিতি সামাল দিতে হারুন নতুন করে রকির সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। এই সখ্য ছিল মূলত একটি পরিকল্পিত ফাঁদ। বৃহস্পতিবার চাঁদাবাজির কথা বলে রকিকে বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়া হয়। বনানীর অদূরে একটি নির্জন গলিতে আগে থেকেই ওৎ পেতে ছিলেন হারুন, বাপ্পী, ফজলুসহ কয়েকজন। রকি মোটরসাইকেলে সেখানে পৌঁছালে প্রথমে পেছন থেকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে রকি সড়কে পড়ে গেলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। এরপর হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে অভিযান চালায়। র‌্যাব সদস্যরা শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক এলাকা থেকে মূল অভিযুক্ত হারুনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে চক্রটি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং এখন তাঁদের নিজেদের দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষের জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

শাজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিক ইকবাল বলেন, রকি হত্যার ঘটনায় তাঁর মা হালিমা বেগম বাদী হয়ে হারুন, বাপ্পীসহ আটজনের নামে মামলা দায়ে করেছেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, সন্ত্রাসী চক্রের মধ্যে ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে রকিকে খুন করা হয়। এ ছাড়াও গত বছর বাপ্পীকে হত্যার উদ্দেশ্যে কুপিয়ে জখম করার সঙ্গে রকি জড়িত ছিলেন। সেই ঘটনার জেরও রয়েছে। খুনের নেপথ্যে আরও কী কারণ থাকতে পারে, তা জানার জন্য হারুনকে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *