বুধবার, মে ২০

প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপক কায়কোবাদ: এআই যুগে প্রকৌশল শিক্ষার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ!

|| নিজস্ব প্রতিবেদক ||

প্রযুক্তির এই দ্রুত বদলে যাওয়া সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যেন মানুষের সামনে এক নতুন পৃথিবীর দরজা খুলে দিয়েছে। মানুষের চিন্তা, কাজ, শেখা— সবকিছুর ভেতরেই সগৌরবে জায়গা করে নিয়েছে প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর শক্তি। কখনও তা মানুষকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে, কখনও আবার অজানা এক আশঙ্কার সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। সেই পরিবর্তনের ঢেউ এসে লেগেছে প্রকৌশল শিক্ষার অঙ্গনেও।

ভবিষ্যতের প্রকৌশলীরা কেমন হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ কতটা বদলাবে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক কোন নতুন রূপ নেবে— এমন সব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে সামনে রেখেই প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির সিএসই বিভাগ আয়োজন করেছিল “এআই যুগে প্রকৌশল শিক্ষা: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক একটি সময়োপযোগী সেমিনার।

বুধবার (২০ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে অংশ নিয়েছিলেন বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রযুক্তিপ্রেমীরা। পুরো আয়োজনটি যেন ছিল ভবিষ্যৎকে কাছ থেকে দেখার এক সম্মিলিত চেষ্টা। অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট কম্পিউটার বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ। তাঁর বক্তব্যে ছিল অভিজ্ঞতার গভীরতা, আবার তরুণদের জন্য স্বপ্ন দেখার আহ্বানও। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের প্রকৌশলীদের শুধু প্রযুক্তি জানলেই চলবে না; তাদের হতে হবে সৃজনশীল, মানবিক এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে দক্ষ।

বর্তমান এআই যুগে সিএসই শিক্ষার সামনে যেমন অসীম সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেছে, তেমনি তৈরি হয়েছে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও। একসময় রাত জেগে কোড লিখে, ভুল করে, আবার শিখে একজন শিক্ষার্থী নিজেকে গড়ে তুলত। এখন এআই টুলস মুহূর্তেই জটিল সমস্যার সমাধান করে দিচ্ছে। ফলে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার জানাই যথেষ্ট নয়; বরং প্রযুক্তিকে বুঝে সৃজনশীলভাবে কাজে লাগানোর দক্ষতাই হয়ে উঠছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দেখা দিচ্ছে মৌলিক চিন্তার সংকট, অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং একাডেমিক সততা রক্ষার মতো চ্যালেঞ্জ। দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের বিশ্লেষণী ক্ষমতার চর্চা কমিয়ে এআই-এর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। যা তাদের ক্যারিয়ারকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

অন্যদিকে, এই প্রযুক্তিই আবার নতুন স্বপ্নেরও জন্ম দিচ্ছে। গবেষণা, উদ্ভাবন, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং স্মার্ট প্রযুক্তি তৈরির ক্ষেত্রে এআই খুলে দিয়েছে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। তাই বর্তমান সময়ে সিএসই শিক্ষার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হয়ে উঠেছে— এমন প্রকৌশলী তৈরি করা, যারা প্রযুক্তিকে শুধু ব্যবহারই করবে না; বরং মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতাকে সঙ্গে নিয়ে তা মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাবে।

সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী ড. ফারজানা আলম। তিনি প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর কথায় যেন এক ধরনের সতর্কবার্তাও ছিল— প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হবে, মানুষকে তত বেশি মানবিক হতে হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির প্রিন্সিপাল অ্যাডভাইজর অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল কবির। সভাপতিত্ব করেন স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন অধ্যাপক ড. শহিদুল ইসলাম খান। বক্তারা এআই যুগে নৈতিকতা, দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহার এবং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

তারা আরও বললেন, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি এমন এক শিক্ষাঙ্গন, যেখানে শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে নিজেদের ভেতরের সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করতে শেখে। বিশ্ববিদ্যালয়টি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন একাডেমিক সেমিনার ও ক্লাবভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সফট স্কিল উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ফলে শিক্ষার্থীরা শুধু ভালো গ্র্যাজুয়েট হিসেবেই নয়, বরং আত্মবিশ্বাসী ও মানবিক নাগরিক হিসেবেও নিজেদের গড়ে তুলছে।

সবমিলিয়ে এটি শুধু একটি সেমিনার ছিল না; বরং ভবিষ্যতের শিক্ষা, প্রযুক্তি ও মানবিকতার সম্পর্ককে নতুন করে ভাবার এক অনুপ্রেরণাময় প্রচেষ্টা ছিল। প্রযুক্তির ভিড়েও ‘মানুষ’ হয়ে থাকার আহ্বান—বারবার ফিরে এসেছে পুরো আয়োজনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *