
|| শাকির সবুর ||
প্রায় ঘণ্টাখানিক হলো আমরা উড়ছি। উড়ছি তো উড়ছিই। পেটের ক্ষুধা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। অবশ্য সাথের ব্যাগে বাসা থেকে আনা পাওরুটি আর খেজুর আছে। সেদ্ধ ডিম তো বাসেই খেয়েছি। ওয়েটিং লাউঞ্জে ইউনাইটেড গ্রুপের দেওয়া নাস্তার সাথে কলাও খেয়েছি। ইচ্ছে করলে এখন পাওরুটি খেয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু খাবো কী দিয়ে! তার চেয়ে বড় কথা সাথে পানি নেই। আমরা দুজন আধ-খাওয়া দুটি পানির বোতল ইচ্ছে করেই ওয়েটিং লাউঞ্জে রেখে এসেছি। কারণ প্লেনে তরল জাতীয় কোনো কিছু সাথে করে নেওয়া নিষেধ। কেউ যদি সাথে করে নিয়েও আসে তাহলে শেষ স্ক্যানিং গেটে রেখে দেয়। কিন্তু ডানে-বায়ে লক্ষ করে দেখি অনেকেই পানির বোতল সাথে করে নিয়ে এসেছে। কারো কারো সাথে দুই লিটারের ফ্রেশ পানির বোতলও আছে। জিজ্ঞেস করলাম, কিভাবে আনলেন? গেটে আটকায়নি?
সহাস্যে বলল, না, আটকায়নি তো।
তাদের সেই হাসিতে বিজয়ের আভাস। মনে মনে ভাবলাম নিশ্চয় হজ্জ ফ্লাইট বলে ছাড় দিয়েছে। নিজেকে বোকাও মনে হলো। অগত্যা লান্স সরবরাহের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু সহসা লান্স সরবরাহের কোনো লক্ষণ চোখে পড়ল না। ততক্ষণে পেটের ক্ষুধা ছাপিয়ে তৃষ্ণা প্রকট হয়ে উঠেছে।
বেলা দুইটার দিকে সামনে-পেছনে খাবার সরবরাহের টুকটাক শব্দ শোনা গেল। ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে সুবাসও এলো। সেই সুবাস পেয়ে ক্ষুধা যেন আরও আসকারা পেল। হ্যাংলার মতো সামনে-পেছনে তাকালাম। হ্যাঁ, নাক-কান কেউই ভুল করেনি। ভুল গন্ধ পায়নি। ভুল শব্দও শোনেনি। চোখও তাই বলছে, ক্যাবিন ক্রুরা খাবারই সরবরাহ করছে। সামন-পিছন দু দিক থেকেই খাবার সরবরাহ করতে করতে মাঝখানের দিকে আসছে। তবে মুশকিল হচ্ছে প্লেন ঝাকুনি খাচ্ছে তাই তাদের কাজ খুব আগাচ্ছে না। সম্ভবত আমরা ভারতের কোনো মরু অঞ্চল অথবা কোনো সমুদ্র অঞ্চল পার হচ্ছি। লাউড স্পিকারে যার যার সিট বেল্ট বাঁধার নির্দেশনা এলো। খানিক পর ঝাকুনি আরও বাড়লে খাবার সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হলো। মনে মনে নিজের ভাগ্যকে ভর্ৎসনা করলাম, আমার কাছাকাছি এসেই খাবার সরবরাহ বন্ধ করতে হলো! আর দুই সারি হলেই তো আমার পর্যন্ত খাবার পৌঁছতো! পেছন থেকেই হোক আর সামন থেকেই হোক। কপাল!
প্রায় আধঘণ্টা পর পুনরায় খাবার সরবরাহ করা শুরু হলো। তখনো অবশ্য ঝাকুনি থামেনি। তবে কিছুটা কমেছে। আমি আর অপেক্ষা করতে পারলাম না। খাবার হাতে পেয়েই খেতে শুরু করে দিলাম। স্টার্টার হিসেবে দিয়েছে ছোট একটা বান আর ছোট্ট বাটারের প্যাকেট। মেইন কোর্সে ছোট ফয়েল বক্সে চিকেন বিরিয়ানি। স্বচ্ছ প্লাস্টিকের বক্সে মিক্স সালাদ। আর একটি ছোট বক্সে প্যান কেক। ছোট এক বোতল পানি। ছোট একটা প্যাকেট জুস। আহামরি খাবার না। তবে ক্ষুধাপেটে তাই অমৃতের মতো মনে হলো।
খাবার শেষে চা-কফি বা সফ্ট ড্রিংক্স জাতীয় কিছুই দেওয়া হলো না। আমি মোটামুটি বিস্মিতই হলাম। আমার বিমানে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা খুব বেশি না থাকলেও একবারে কমও নেই। বাংলাদেশ বিমানসহ ইরান এয়ার, কাতার এয়ার, কুয়েত এয়ার, টার্কিশ এয়ার, গাল্ফ এয়ার, মোটামুটি সব এয়ার লাইন্সেই কমবেশি যাতায়াত করেছি। তবে আতিথেয়তায় এত কার্পণ্য আর কোনো এয়ার লাইন্সে দেখিনি। সব এয়ার লাইন্সেই লান্সের শেষে ক্রুরা চা-কফি নিয়ে এসে ডাকে, কফি, টি। সফ্ট ড্রিংসের দু তিনটা অপসন থাকে। আপনি যে কোনো একটা বেছে নিতে পারেন। শুনেছি স্পেশাল হজ্জ ফ্লাইটে হজ্জযাত্রীদের খুবই সম্মান করা হয়। বাড়তি যত্ন-আত্তি করা হয়। বাড়তি তো দূরে থাক আসলটাও চোখে পড়ছে না।
ক্রুরা ইশারা-ইঙ্গিতে জানালাগুলো বন্ধ করে দিতে বলছে। কেউ কেউ নিজে গিয়ে বন্ধও করছে। তার মানে আর কিছু নেই। এখন ঘুমাও। আমিও ঘুমাবার চেষ্টা করলাম।
ঘুম আসছে না। সিটগুলোর দুই সারির মধ্যবর্তী সরু করিডোর দিয়ে যাত্রীদের অনবরত আসা-যাওয়া চলছেই। আমি সারির প্রান্তের সিটে বসেছি বলে তাদের কারো কারো পা আমার পায়ে এসে লাগছে। অথবা কাঁধে এসে হাত পড়ছে। অসচেতনভাবে কারো কারো হাত লেগে মাথার ওপরের রিডিং লাইট জ্বলে উঠছে। সেই আলোর ছটা আমার চোখে এসে তীরের মতো বিঁধছে। তাকে সেটি নেভাতে বললে, সে আর সেটি নেভানোর বোতাম খুঁজে পাচ্ছে না।
আবারও আমি তৃষ্ণা অনুভব করলাম। আমার রিমোটের ম্যান-কল বোতাম টিপে অপেক্ষা করলাম বেশ কিছুক্ষণ। কিন্তু কেউ আসছে না দেখে বিরক্ত হয়ে পাশের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, পানি পিপাশা লেগেছে। ম্যান কল দিলাম। অথচ কেউ আসছে না। এরা কি পানিও দেয় না নাকি?
তিনি মুসকি হেসে বললেন, ওই যে সামনে সার্ভিস কাউন্টারে দিচ্ছে। আপনাকে যেয়ে নিয়ে আসতে হবে।
তাঁর জবাবে যুগপত বিস্মিত এবং বিরক্ত হয়ে উঠে গেলাম পানি আনতে। যাবার সময় স্ত্রী বললো, আমার জন্যও এক গ্লাস নিয়ে এসো। ফিরলাম দুই হাতে দুই পানির গ্লাস নিয়ে। খুবই সতর্কতার সাথে, যাতে ছলকে না পড়ে। একটু পর দেখি কেউ কেউ চা খাচ্ছে। কোথায় পেলেন? জিজ্ঞেস করতেই সেই একই জবাব, দিচ্ছে। তবে কাউন্টারে যেয়ে নিয়ে আসতে হবে। স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম চা খাবে নাকি? বলল, না। তুমি খেলে নিয়ে আস।
আবারও উঠে গিয়ে চা নিয়ে এলাম। অবশ্য কফি হলে ভালো হতো। ভ্রমণের ক্লান্তি কিছুটা কমতো। কিন্তু কফি নেই। শুধু চা। হায়রে বিশেষ আতিথেয়তা!
গভীর অভিনিবেশে সামনের মনিটরে যাত্রাপথের মানচিত্রের দিকে চোখ রাখছিলাম। প্রতি মুহূর্তেই তাতে যাত্রাপথের চিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি গন্তব্য কতদূর এবং আর কত সময় পর গন্তব্যে পৌঁছবো তাও দেখাচ্ছিল। তবুও মনের ভেতর অপেক্ষার ধৈর্য বাধ মানতে চাচ্ছিল না। পথ যেন আর ফুরাচ্ছিলই না! কত সাগর-মরু পার হয়ে এলাম তবুও কি এই পথের শেষ নেই! এ যাত্রার শেষ নেই! কখন সেই পুণ্যভূমির মাটি স্পর্শ করবে আমাদের বিমান, যেখানে পৃথিবীর প্রথম ঘর পবিত্র কাবা! যে কাবার অনতি দূরেই পৃথিবী আলো করে ধূলার ধরনিতে আবির্ভুত হয়েছিলেন পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, সমগ্র সৃষ্টজগতের রহমত, প্রিয়নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)। পৃথিবীর প্রথম মানব আদিপিতা আদম (আঃ) এবং আদিমাতা হাওয়া (আঃ) পরস্পরে প্রথম পরিচিত হয়েছিলেন যে ভূমিতে, সেই বিশাল প্রান্তর আরাফা। সেই পবিত্র কাবা, প্রিয় নবী (সাঃ)-এর সেই পবিত্র জন্মভিটা আর কত দূরে! আর কত সময় অপেক্ষার পর আমাদের বিমান পুণ্যভূমি মক্কার প্রবেশদ্বার জেদ্দার মাটি স্পর্শ করবে!
মনের অস্থিরতাকে দূর করার জন্য মাঝে মাঝে যখন মনিটর থেকে চোখ তুলে ডানে-বামে অন্যান্য যাত্রীর দিকে তাকাচ্ছিলাম তখন তাঁদের চোখে-মুখেও সেই একই অস্থিরতা লক্ষ করছিলাম। এ অস্থিরতা বিরক্তির নয়। দীর্ঘ পথযাত্রায় ক্লান্তির নয়। আজন্ম লালিত স্বপ্ন পবিত্র কাবার দর্শন, প্রিয় নবী (সাঃ)-এর জন্মভূমির পুণ্যমাটি স্পর্শ করার অধীর আগ্রহের অপেক্ষা।
এক সময় এই অধীর অপেক্ষার প্রহর ফুরালো। প্লেনের লাউড স্পিকারে ঘোষণা এলো, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা জেদ্দা বিমানবন্দরে অবতরণ করতে যাচ্ছি। আপনারা আপনাদের আসনগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসুন। নিজ নিজ সিটবেল্ট বেঁধে ফেলুন!
ঘোষণার সাথে সাথে প্লেনের ভেতর আনন্দের হিল্লোল বয়ে যেতে লাগল। যাত্রীরা চঞ্চল হয়ে ওঠলো। ক্যাবিন ক্রুরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল ঘোষিত নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য। বিমান যখন জেদ্দা বিমানবন্দরের মাটি স্পর্শ করলো আমাদের ঘরিতে তখন রাত প্রায় আটটা। জেদ্দার স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটা প্রায়। বাইরে ঝলমলে রোদ। রোদের আলোয় বহুদূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, বিশালকায় জেদ্দা কিং আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নানা স্থাপনা। কত বিমান দাঁড়িয়ে আছে। কত গাড়ি। কত দালান-কোঠা। কত কত আকাশছোঁয়া সুউচ্চ ল্যাম্পপোস্ট।
প্রায় তিন কিলো মিটারের মতো পথ ট্যাক্সি করে বিমান এসে থামলো তার নির্ধারিত স্থানে। গেট থেকে বের হয়ে লাগোয়া সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলাম। মাটিতে প্রথম পা রাখতেই সমস্ত শরীরে এক অচেনা শিহরণ অনুভব করলাম। এই মাটিতে জন্মেছেন প্রিয় নবী (সাঃ)! এই মাটিতে হেঁটেছেন তিনি! আমি এখন পবিত্র মক্কা থেকে মাত্র ৮৯ কিলোমিটার পশ্চিমে সেই মাটিতেই পা রেখেছি! কখন দেখবো সেই পবিত্র মক্কাভূমি! প্রিয় নবী (সাঃ)-এর জন্মভূমি! কেমন যেন আনমনা হয়ে গেলাম। অবশ্য সেই অবস্থা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। সহযাত্রীদের ঠেলা-ধাক্কায় মুহূর্তেই স্বস্ত্রীক আমিও সামনে অপেক্ষমান শাটল বাছে চড়ে বসলাম। বাস আমাদের নিয়ে রওনা হলো মূল টার্মিনালের দিকে। এই যাত্রাও বেশ দীর্ঘ। কত বড় এই বিমানবন্দর! (ক্রমশ…)
লেখক: অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
