সোমবার, ফেব্রুয়ারি ২

নারীদের অবমাননা ও মিথ্যাচারকারীরা কখনো জনদরদি হতে পারে না: খুলনায় তারেক রহমান

|| শেখ শাহরিয়ার | জেলা প্রতিনিধি (খুলনা) ||

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, যারা নারীদের অসম্মান করে, জনগণের সামনে মিথ্যা বলে এবং ভোটাধিকার কেড়ে নেয়, তারা কখনো দেশপ্রেমিক বা জনদরদি শক্তি হতে পারে না। নারীবিদ্বেষী বক্তব্য ও মিথ্যাচারের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক দল নিজেদের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে খুলনার প্রভাতী স্কুল মাঠে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপির আয়োজনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তারেক রহমান। দীর্ঘ সময় ধরে দেওয়া বক্তব্যে তিনি নারীর মর্যাদা, ভোটাধিকার, গণতন্ত্র ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন। জনসভায় বিপুল মানুষের উপস্থিতিতে মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।

তারেক রহমান বলেন, “দেশ পরিচালনা শুধু কথার ফুলঝুরি দিয়ে সম্ভব নয়। বাস্তব কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে।” বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রথম দায়িত্ব হবে দেশ পুনর্গঠন—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষকে নিয়ে এই পুনর্গঠন করতে হবে। শুধু একটি গোষ্ঠীকে নিয়ে দেশ গড়া যায় না।

নারীর ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে পিছনে রেখে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই সফল হতে পারে না। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারীদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে স্কুল থেকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত বিনা মূল্যে শিক্ষা চালু করেছিলেন, যাতে তারা শিক্ষিত হয়ে আত্মনির্ভরশীল হতে পারে।

নির্বাচনের প্রাক্কালে একটি রাজনৈতিক দলের নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, ওই দলের এক নেতা কর্মজীবী মা-বোনদের উদ্দেশে এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা পুরো জাতির জন্য লজ্জাজনক। পরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে তারা আইডি হ্যাক হওয়ার অজুহাত দিয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এভাবে আইডি হ্যাক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জনগণের সামনে মিথ্যা বলেই তারা নিজেদের পরিচয় দিয়েছে।

তিনি বলেন, “যারা ধর্মের কথা বলে, তারা ভুলে যাচ্ছে—নবী করিম (সা.)-এর সহধর্মিণী হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। তাহলে নারীদের কর্মজীবন নিয়ে কটাক্ষ করার অধিকার কারও নেই।”

পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নারীদের অবদানের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, লাখ লাখ নারী শ্রমের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে আজ অনেক নারী সংসারের দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছেন। অথচ তাদেরই অপমান করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার হরণের অভিযোগ তুলে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, গত ১৫–১৬ বছরে দেশের মানুষ জাতীয় ও স্থানীয় কোনো নির্বাচনেই প্রকৃতভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। মত প্রকাশ করতে গেলেই অনেককে গুম, খুন কিংবা নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে দল-মত নির্বিশেষে জনগণের আন্দোলনের মাধ্যমেই স্বৈরাচারের পতন ঘটে।

আগামী ১২ তারিখের নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় পর মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেতে যাচ্ছে। সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একটি মহল ভোট গণনা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।

ক্ষমতায় এলে বিএনপির পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, প্রতিটি পরিবারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দেওয়া হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে নারীদের ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে তোলা হবে। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য চালু করা হবে ‘কৃষি কার্ড’, যার মাধ্যমে ঋণ, সার, বীজ ও কীটনাশক সহজে পাওয়া যাবে। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করার ঘোষণাও দেন তিনি।

খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একসময় শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত খুলনা আজ মৃতপ্রায়। বিএনপি সরকার গঠন করলে বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করে অঞ্চলটিকে আবার কর্মচঞ্চল শিল্পনগরীতে রূপান্তর করা হবে। নারী ও পুরুষ উভয়ের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে। তরুণদের জন্য আইটি পার্কসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

জনসভায় সভাপতিত্ব করেন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা। বক্তব্য রাখেন খুলনা-২ আসনের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু, খুলনা-৩ আসনের প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা-৪ আসনের প্রার্থী আজিজুল বারী হেলালসহ দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।

উল্লেখ্য, দীর্ঘ ২২ বছর পর খুলনায় সরাসরি জনসভায় বক্তব্য দিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার উপস্থিতিকে ঘিরে পুরো সমাবেশস্থল জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *