Saturday, October 10

নাগেশ্বরীতে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, রাজনৈতিক পরিচয় ঘিরে প্রশ্ন

|| কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ||

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায় নতুন সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ১৫টি ডিলারশিপের তালিকায় আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম থাকার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তবে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরা।

গত বুধবার (৭ অক্টোবর) কৃষি অর্থনীতিবিদ শাহানাজ আক্তারের স্বাক্ষরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফলাফলে নাগেশ্বরী পৌরসভা ও উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের জন্য সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশ করা হয়। তালিকাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ডিলারদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ১৫ জন সার ডিলার নিয়োগের জন্য জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়েছিল। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আলাউদ্দিন এ কমিটির আহ্বায়ক। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহরিয়ার হোসেন সদস্যসচিব এবং উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব মোখলেছুর রহমান কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তালিকায় যাঁদের নাম নিয়ে আলোচনা

প্রকাশিত তালিকার কয়েকজন ডিলারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রায়গঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শফিকুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইসলাম ট্রেডার্স, সন্তোষপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ খলিলুর রহমানের খালেদা ট্রেডার্স এবং বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য ও এমপিওভুক্ত কলেজের প্রভাষক রওশন আলী খানের রিদম এন্টারপ্রাইজ তালিকায় স্থান পেয়েছে।

এ ছাড়া হাসনাবাদ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি আব্দুর রশিদের বড় ভাই কৃষক লীগ নেতা আজাদ আলীর কামাল ট্রেডার্স, কালীগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা দীপু চন্দ্র সরকারের দীপালী ট্রেডার্স এবং নারায়ণপুর ইউনিয়নের জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান প্রার্থী ইয়াকুব আলীর ইয়াকুব ট্রেডার্সের নাম নিয়েও আলোচনা চলছে।

স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন এবং যাচাই-বাছাইয়ের বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁরা নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনরায় পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় ও অভিযোগের সত্যতাও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ

সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতা।

উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক রোকনুজ্জামান টুকু চৌধুরী ফেসবুক লাইভে এসে নিয়োগ তালিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাদের নাম সার ডিলার নিয়োগের তালিকায় থাকা মেনে নেওয়া যায় না। এ ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলার কথাও জানান তিনি।

হাসনাবাদ ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক লাভলু তাঁর ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘বিএনপির লোক সহজেই বিক্রি হয়। তার প্রমাণ নাগেশ্বরী উপজেলার ১৪টা ইউনিয়নের সার ডিলারশিপ…।’

অন্যদিকে পৌর কৃষক দলের সদস্যসচিব আদম আলীও এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের নাম সুপারিশ করা হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এসব বক্তব্য ও অভিযোগের পক্ষে কোনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

‘অভিযোগ ভিত্তিহীন’, দাবি বিএনপি নেতার

নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব মোখলেছুর রহমান বলেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। নির্বাচিত ডিলারদের আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, সেগুলো অপপ্রচার বলেও দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, কুড়িগ্রামের উপপরিচালক আবু ফাত্তাহ্ মো. রওশন কবির বলেন, উপজেলা কমিটির যাচাই-বাছাইয়ের পরই তালিকাটি জেলা কমিটিতে এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমি আসলে জানি না, এখানে কে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি আর কে বিএনপি।’

রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।

স্বচ্ছতা নিশ্চিতের দাবি

সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যে স্থানীয়ভাবে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। বিশেষ করে যাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তাঁদের বিষয়ে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতা ও নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন সমালোচকেরা।

সার কৃষি উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। ফলে ডিলার নিয়োগে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এ অবস্থায় রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ যাচাই এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করা হলে বিষয়টি নিয়ে সৃষ্ট সংশয় দূর হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *