
|| রফিকুল ইসলাম | নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি ||
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি লালনচর্চার ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র হলেও এখন সেই চর্চা হচ্ছে নাগেশ্বরীতে গুরুগৃহে। গানের কথার মধ্য দিয়ে তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে লালনের মানবিক দর্শন, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা এবং আত্মঅনুসন্ধানের শিক্ষা। বেসরকারী সংস্থা মায়েরতরীর পরিচালনায় প্রতি শুক্র ও শনিবার উপজেলার কলেজ পাড়ায় শান্তনালয় গুরুগৃহে বসে এ আসর।
সরেজমিন দেখা গেছে, কলেজ পাড়া শান্তনালয় গুরুগৃহে বসে গুরু পূর্ণ চন্দ্র ও রাজু আহমেদ, মায়ের তরীর পরিচালনায় বিনাবেতনে মন দিয়ে গান শিখছে ছিদরাতুল মুনতাহা মুন, সামিউল ইসলাম শানী, দিবা মনি সরকার, তন্ময় মোহন্ত তীর্থ, পূজা মনি রায়সহ বেশ কয়েকজন শিশু। তাদের কাছে লালনের গান শুধু গাওয়া নয়, বোঝারও বিষয়। লালনের গানের মাধ্যমে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ না করার কথা শিখছে তারা। যেন এ গান হয়ে উঠেছে আনন্দের পাশাপাশি তাদের নতুন কিছু শেখার মাধ্যম। গানের সঙ্গে সঙ্গে তারা জানছে লালনের জীবন ও ভাবনা। এছাড়াও পহেলা কার্তিক মহাত্মা ফকির লালনের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের প্রাক্কালে কুড়িগ্রামে মায়ের তরীর ৯টি গুরুগৃহে একসঙ্গে চলছে লালনচর্চা।

মায়ের তরী সংগঠনের গুরু নারায়ণ রায় বলেন, প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের অনেকেই আধুনিক বিনোদনের নানা মাধ্যমে অভ্যস্ত। তাদের শেকড়ের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করতে নিয়মিত লালন, বাউল ও লোকগানের চর্চা জরুরি। গানের কথাগুলো বুঝিয়ে শেখানো হলে শিশুরা কেবল শিল্পী নয়, মানবিক মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠবে। আর মায়ের তরী সেই কাজটিই করার চেষ্টা করছে।
সংগঠক ইউসুফ আলমগীর বলেন, লালনকে কেবল কুষ্টিয়ার আখড়াবাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তাঁর দর্শনের ব্যাপ্তি পূর্ণতা পায় না। এ এলাকার শিশুরাও লালনের উত্তরাধিকার বহন করতে পারে। তাদের কণ্ঠে লালনের গান তুলে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। লোকসংগীতের চর্চার পাশাপাশি শিশুদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ তৈরি করাই মায়ের তরীর উদ্দেশ্য। প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ তৈরি হলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হবে।
নির্বাহী পরিচালক সুজন বেদ বলেন, মায়ের তরীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে একটি লোক সংগীত ইনস্টিটিউট, ডিজিটাল আর্কাইভ এবং প্রবীণ সাংস্কৃতিকসেবীদের জন্য আশ্রয়স্থল গড়ে তোলা। হারিয়ে যেতে বসা লোকগান, বাদ্যযন্ত্র, শিল্পী ও তাঁদের জীবনকথা সংগ্রহ করে ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অসহায় হয়ে পড়া প্রবীণ লোকশিল্পী ও সাংস্কৃতিকসেবীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার প্রত্যাশা রয়েছে।
কুড়িগ্রাম লালন একাডেমির সাধারণ সম্পাদক শিবলী সাদিক আতিক বলেন, লালনের গান কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সম্প্রদায়ের সম্পদ নয়; এটি বাংলার মানুষের মানবিক চেতনার এক গুরুত্বপূর্ণ ধারক। আর কুড়িগ্রামের মতো সীমান্তবর্তী ও নদীভাঙ্গনপ্রবণ জনপদে শিশুদের মধ্যে এই চর্চা ছড়িয়ে পড়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। লালনের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের প্রাক্কালে মায়ের তরীর ৯টি গুরুগৃহ যেন সেই বার্তাই দিচ্ছে। ছেঁউড়িয়ার আখড়া থেকে বহুদূরে, নদী-জনপদের শিশুদের কণ্ঠেও লালনের গান বেঁচে থাকতে পারে। গানটির সুরের সঙ্গে যদি তাঁর মানবিক দর্শনও নতুন প্রজন্মের মনে পৌঁছে যায়, তবে সেটিই হয়ে উঠতে পারে লালনচর্চার সবচেয়ে বড় বিস্তার।
