বুধবার, মে ৬

কাবার দুয়ারে দাঁড়িয়ে | পর্ব-০৩

প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার পথ চলার পর বাস আমাদের নির্ধারিত টার্মিনালে নামিয়ে দিলো। যেহেতু আমাদের ইমিগ্রেশন ঢাকাতেই সম্পন্ন হয়েছিল, আর বেল্টে দেওয়া লাগিজের জন্যও অপেক্ষা করতে হবে না। হজ্জ কর্তৃপক্ষের তত্তাবধানে সেগুলো যার যার হোটেলে পৌঁছে যাবে। সুতরাং বাস থেকে নেমেই আমরা ছুটলাম মক্কার উদ্দেশে পূর্ব থেকেই আমাদের জন্য অপেক্ষমাণ বাসের দিকে। সিকি কিলোমিটারের মতো পথ পায়ে হেঁটে এসেই আমরা বাসে উঠলাম। পাশাপাশি বেশ কটি বাস দাঁড় করানো। প্রতিটি বাসই প্রায় একই রকম। ঝকঝকে চকচকে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। দু পাশে দুটি করে সিট। মোট সিট সংখ্যা ৫২। আমাদের কাফেলায় যেহেতু যাত্রী সংখ্যা ৬৫ জন। তাই আমাদের জন্য দুটি বাস নির্ধারিত। একটিতে ৩৩ জন। অপরটিতে ৩২ জন। আমাদের মুয়াল্লিম মওলানা মজিরুদ্দিন, এজেন্সি প্রতিনিথি তাশফিন আহমেদ এবং মওলানা আনোয়ার হুসাইন আমাদের গাইড করছেন।

বাসে উঠে বসতে গিয়ে দেখি আমরা দুজনই সবার পেছনের সিটে। সামনের সিটগুলো আগেই ফিলাপ হয়ে গেছে। সবকিছু গুছিয়ে-গাছিয়ে সুস্থির হতেই দেখি সবার হাতে হাতে একটা করে সুন্দর বক্স। বোঝাই যাচ্ছে বক্সের ভেতরে স্ন্যাক্স জাতীয় খাবার। আমাদেরগুলো কোথায়! নিশ্চয় বাস কর্তৃপক্ষ ভুল করে আমাদের সিটে বক্স দেয়নি। পেছন থেকে শব্দ করে জানান দিলাম, এখানে দুটি বক্স দেওয়া হয়নি।

কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। একটু পর আবারও বাস কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে আগের চেয়ে শব্দ করে বললাম, এখানে বক্স দেওয়া হয়নি। দুটি বক্স কম আছে।

এবারও কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। মনে মনে একটু বিরক্তই হলাম। আমার স্ত্রী বিরক্ত হলো আমার ওপর। ভাল করে লক্ষ করে দেখি দু সারি সামনে দুই সিটের একটাতে একজন যাত্রী বসেছেন। তার পাশের সিটটা ফাঁকা। ফাঁকা সিটে একটা বক্স রাখা। উঠে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে কি কেউ আছে?

তিনি বললেন, না।
-এটা কি আপনার?
-না। মুচকি হেসে জবাব দিলেন।

আমি তাঁর অনুমতি নিয়ে বক্সটা তুলে নিলাম। বুঝতে পারলাম ভুল আমাদেরই হয়েছে। কর্তৃপক্ষ কোনো ভুল করেনি। তারা ঠিক ৩২ জন যাত্রীর জন্য ৩২টি সিটের ওপর ৩২টি বক্সই রেখেছে। এরকম আরও একটা বক্স নিশ্চয় আরও কোনো একটা ফাঁকা সিটে দেওয়া আছে। মনে মনে খুঁজতে লাগলাম সেটা। আরও দু’সিট সামনে এগোতেই পেয়েও গেলাম। তখন ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট হলো। আসলে দুটা সারিতে দুই সিটে একজন একজন করে বসার কারণেই আমাদের সবার পেছনের সিটে বসতে হয়েছে। যেখানে স্ন্যাক্সের বক্স দেওয়া ছিল না।

বক্সের ভেতর একটা সিজ-বান, একটা কেক, ভেতরে খেজুরের পুর দেওয়া একটা বিস্কিট, কয়েকটা কফি ক্যান্ডি, একটা জুস আর একটা ছোট পানির বোতল। বোতল খুলে পানি খেলাম। তারপর জুস। শরীরটা বেশ চাঙ্গা হলো তাতে।

প্লেনে উঠার আগ মুহূর্তে ঢাকা বিমানবন্দরের ডিপার্চার লাউঞ্জে জোহরের নামাজ পড়ে নিয়েছিলাম। প্লেনে আর আসরের নামাজ পড়িনি। ঠিক করেছিলাম নেমে কোথাও পড়ে নেবো। কিন্তু নামার সাথে সাথে দ্রুত বাসে উঠে যাবার কারণে আর আসরের নামাজ পড়া হয়নি। কেন যেন বাসও ছাড়ছে না। তাই সিটে বসেই আসরের নামাজ পড়ে নিলাম। তার পরও দেখি বাস ছাড়ছে না। কি এক অজানা কারণে অপেক্ষা করছে। আবারও অপেক্ষা! কতক্ষণ!

শেষপর্যন্ত মক্কার উদ্দেশে আমাদের বাস ছাড়লো। প্রায় একঘণ্টা পর। তখন বিকেল প্রায় গড়িয়ে গেছে। রোদের তীব্রতা কিছুটা কোমলতা পেয়েছে। সকালের সোনারোদের মতো। এয়ারপোর্ট কম্পার্টমেন্ট ছাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতেই চারপাশটা গ্রামের মতো লাগছে। নগরের কোনো চিহ্নই নেই। রাস্তার দু’ধারে যতদূর চোখ যায় ধুধু প্রান্তর। তবে আমাদের দেশের মতো তা সবুজে ছাওয়া নয়। পাথুরে মাটির ধূধূ প্রান্তর। কিছুদূর পর পর খেজুরবৃক্ষের সাড়িও চোখে পড়ছে। আসন্ন সন্ধ্যার আগোয়ান অন্ধকারকে লক্ষ্য করে সেই খেজুরবৃক্ষ-সাড়ির ফাঁক দিয়ে বিদায়-উদ্যত সূর্য তার আলোকরশ্মির তীর নিক্ষেপ করছে। কিন্তু তাতে যে সে সফল হচ্ছে সেরকম মনে হচ্ছে না। ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে তার আলোর তীব্রতা।

একসম গমনোন্মুখ সূর্যের আলোকে তাড়িয়ে দিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার চরাচরের দখল নিতে চাইলো। তবে চারদিক অন্ধকার গ্রাস করার আগেই স্ট্রিট লাইটগুলো জ¦লে উঠলো। সেই আলোয় ঝলমল করে উঠল মরুর মহাসড়ক।
বাস আমাদের নিয়ে মোটামুটি দ্রুত গতিতেই এগিয়ে চলেছে। ভেতর থেকে প্রকৃতির এই দিন-রাতের পালাবদল দেখছিলাম আমি। কত চড়াই-উৎরাই যে পার হলাম। কিছুদূর পর পর আলোর ফুলের ঝোপে চোখ আটকে যাচ্ছিল। ভালো করে লক্ষ করলে দেখা গেলো সেগুলো রেস্টুরেন্ট। বৈদ্যুতিক বাতির আতিশয্যে আলোর ফুলের ঝাড়ে পরিণত হয়েছে। পাশেই আলোর পতঙ্গের মতো বেশকিছু গাড়ি পার্ক করা। নিশ্চয় ধনাঢ্য শেখদের সন্তানেরা এসেছে সন্ধ্যা-যাপনের উদ্দেশ্যে! (ক্রমশ…)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *