
|| চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ||
চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় দায়ের করা একটি মামলায় কথিত ভুয়া কাবিননামা তৈরি, জালিয়াতি ও তা ব্যবহারের অভিযোগে তিন বিবাদীর বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পায়নি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মামলাটি তদন্ত শেষে সংস্থাটির প্রতিবেদনে এমন মতামত দেওয়া হয়েছে। তবে তদন্তে কাবিননামার সত্যতা, এক নারী ও তাঁর কন্যাসন্তানের সঙ্গে বাদীর সম্পর্ক, হাসপাতালের নথিপত্র এবং শিশুটির জন্মের পর তোলা একটি ছবিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
পাঁচলাইশ থানার সিআর মামলা নম্বর ৯৩৭/২০২৫-এর তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার বাদী মো. মুসলিমের অভিযোগ ছিল, শেলীনা বেগম ওরফে শেলী আক্তারের সঙ্গে তাঁর কোনো পরিচয় বা বৈবাহিক সম্পর্ক নেই। তাঁর নাম ব্যবহার করে এবং সংশ্লিষ্ট কাজির সিল ও স্বাক্ষর নকল করে একটি ভুয়া কাবিননামা তৈরি করে আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে তদন্ত শেষে শেলীনা বেগম, নিপু মনি ও মো. নাঈম উদ্দিনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৫, ৪৬৮, ৪৬৯, ৪৭১, ৩৮৫, ৫০৬(২), ১০৯ ও ৩৪ ধারায় আনা অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে মতামত দেয় পিবিআই।
কাবিননামার সত্যতা যাচাইয়ে যা উঠে এসেছে
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিতর্কিত কাবিননামায় বিয়ের তারিখ ১ সেপ্টেম্বর ২০২১, বালাম নম্বর ০৫ এবং পৃষ্ঠা নম্বর ৫৭ উল্লেখ রয়েছে। এতে বরের নাম মো. মুসলিম এবং কনের নাম শেলীনা বেগম লেখা ছিল। নথিটিতে কাজি মাওলানা জামাল উদ্দিনের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়।
কাবিননামাটির সত্যতা যাচাই করতে তদন্তকারী কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট কাজি মাওলানা জামাল উদ্দিনের কাছে লিখিতভাবে তথ্য চান। পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাজির কাছ থেকে পাওয়া প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর বালাম নম্বর ০৫-এর ৫৭ নম্বর পৃষ্ঠায় মো. মুসলিম ও শেলীনা আক্তারের নামে কোনো নিকাহনামা লিপিবদ্ধ ছিল না।
তদন্তে আরও উঠে আসে, শেলীনা বেগম কাবিননামাটির সত্যতা যাচাই না করেই বাদী মো. মুসলিমের কাছ থেকে পাওয়া নকল হিসেবে সেটি আদালতে দাখিল করেছিলেন। তবে তিনি নিজে কাবিননামাটি তৈরি বা জাল করেছেন—এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার মতামত, শেলীনা বেগম সরল বিশ্বাসে নিকাহনামাটির অনুলিপি আদালতে দাখিল করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে জাল নথি তৈরির অভিযোগ প্রমাণের মতো প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পূর্বপরিচয় ও সম্পর্কের তথ্য তদন্তে
পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে মো. মুসলিম ও শেলীনা বেগমের পূর্বপরিচয় এবং তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্কের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের দিকে মুসলিম শেলীনাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। পরবর্তী সময়ে মুঠোফোনে তাঁদের নিয়মিত যোগাযোগ ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর শেলীনা বেগম একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
শিশুটির জন্মসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের অংশ হিসেবে পিপলস হসপিটাল লিমিটেডের আইপিডি অ্যাডমিশন রিপোর্ট পর্যালোচনা করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই নথিতে শেলীনার স্বামীর নামের ঘরে ‘লিটন’ লেখা ছিল। হাসপাতালের জন্মসনদেও ‘Selina Akter wife of Mr. Liton’ উল্লেখ থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে বাদী মো. মুসলিমের নাম ‘মো. মুসলিম ওরফে লিটন’ হিসেবে ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
হাসপাতালের কেবিনে শিশুকে কোলে নিয়ে মুসলিমের ছবি
তদন্ত প্রতিবেদনে শিশুটির জন্মের পর হাসপাতালের কেবিনে তোলা একটি ছবির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
পিবিআইয়ের প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে সংগৃহীত রঙিন ছবি পর্যালোচনা করে তদন্তকারী কর্মকর্তা দেখতে পান, শিশুটির জন্মের পর পিপলস হসপিটালের একটি কেবিনে মো. মুসলিম শিশুটিকে কোলে নিয়ে ছিলেন। ওই সময় শেলীনার বোন নিপু মনিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ছবিতে তাঁদের হাস্যোজ্জ্বল অবস্থায় দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ছবিটি এবং হাসপাতালের নথিপত্র তদন্তে উঠে আসা অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে শিশুটির জৈবিক পিতৃত্ব সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।
ভরণপোষণ নিয়ে বিরোধের পর পৃথক মামলা
পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে শেলীনা বেগম ও তাঁর কন্যাসন্তানের ভরণপোষণ দেওয়া বন্ধ করে দেন মো. মুসলিম বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শেলীনা পাঁচলাইশ থানার সিআর মামলা নম্বর ৮৬০/২০২৪ দায়ের করেন।
ওই মামলায় শেলীনা নিজেকে মুসলিমের স্ত্রী হিসেবে দাবি করেন এবং মুসলিমের কাছ থেকে পাওয়া কাবিননামার অনুলিপি আদালতে দাখিল করেন বলে পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া ওই মামলা নিয়ে মুসলিম ও শেলীনার মধ্যে একাধিকবার সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া যায়। এসব বৈঠকে সাক্ষীদের উপস্থিতির বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিশুটির পিতৃপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা হাসপাতালের নথি, ‘লিটন’ নামের ব্যবহার, শিশুটিকে কোলে নিয়ে মুসলিমের ছবির বিবরণ এবং শেলীনার দায়ের করা পৃথক মামলার তথ্য—সব মিলিয়ে শিশুটির পিতৃপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন সামনে এসেছে।
তবে হাসপাতালের নথিতে কোনো নাম থাকা, কোনো ব্যক্তির সঙ্গে শিশুর ছবি থাকা কিংবা কোনো মামলায় কাউকে স্বামী হিসেবে দাবি করা—এসব তথ্যের কোনোটিই এককভাবে জৈবিক পিতৃত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। এ বিষয়ে বিরোধ থাকলে আদালতের এখতিয়ার ও প্রযোজ্য আইন অনুসারে প্রয়োজনীয় নথি, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা যেতে পারে।
অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি বাদী
পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার বাদীকে অভিযোগের সমর্থনে প্রয়োজনীয় দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তবে তদন্ত চলাকালে তিনি অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি।
তদন্তকারী কর্মকর্তা বাদীর মনোনীত দুই সাক্ষীসহ মোট ছয়জনের বক্তব্য গ্রহণ করেন। পাশাপাশি প্রকাশ্য ও গোপন অনুসন্ধানের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তদন্ত কার্যক্রম তদারকি করেন পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার।
সংগৃহীত সাক্ষ্য, নথিপত্র ও পারিপার্শ্বিক তথ্য পর্যালোচনা করে তদন্তকারী কর্মকর্তা মতামত দেন, মামলার তিন বিবাদীর বিরুদ্ধে অভিযোগে উল্লিখিত ধারাগুলোর অপরাধ প্রমাণিত হয়নি।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের
পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে একদিকে কথিত জাল কাবিননামা তৈরি ও ব্যবহারের অভিযোগে তিন বিবাদীর বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ না পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, একই প্রতিবেদনে কাবিননামার সত্যতা যাচাই, মুসলিম ও শেলীনার পূর্বপরিচয়, কন্যাসন্তানের জন্ম, হাসপাতালের নথিপত্র, শিশুটিকে কোলে নিয়ে মুসলিমের ছবির বিবরণ এবং পরবর্তী সময়ে দায়ের করা মামলার তথ্য উঠে এসেছে।
এ পরিস্থিতিতে কাবিননামা নিয়ে বিরোধের প্রকৃত ঘটনা এবং শিশুটির পিতৃপরিচয়সংক্রান্ত প্রশ্নের আইনগত নিষ্পত্তি কীভাবে হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট নারীর দাবি, সন্তানের পিতৃপরিচয় নিশ্চিত করার প্রত্যাশা নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর প্রত্যাশা, বিষয়টির নিষ্পত্তি হবে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রামাণ্য নথি ও আইনগত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে।
তবে পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন আদালতের চূড়ান্ত রায় নয়। প্রতিবেদনে উল্লিখিত মতামত ও তথ্যের আইনগত মূল্যায়ন এবং মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারভুক্ত। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
