
|| বদরুদ্দোজা বুলু | চিলমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি ||
কুড়িগ্রামের চিলমারী-রৌমারী ঘাট ও নৌপথ থেকে একে একে সবকটি ফেরি সরিয়ে নেয়ায় ঘাটটি এখন পুরোপুরি ফেরিশূন্য। ২১ দিন ফেরি চলাচল বন্ধ থাকার পর এবার মেরামতের কথা বলে সরিয়ে নেয়া হলো কদম ফেরিটিও। ফলে বর্তমানে এ নৌপথে ফেরি চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যানবাহন, পণ্যবাহী ট্রাক পারাপার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন চালক ও যাত্রীরা।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে চিলমারী নদীবন্দর ঘাট থেকে কদম নামের ফেরিটি মেরামতের জন্য নারায়ণগঞ্জের ডকইয়ার্ডের উদ্দেশে সরিয়ে নেয়া হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চিলমারী বন্দরের পোর্ট কর্মকর্তা মাহবুব আলম তায়েফ।

জানা গেছে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউএ)’র উদ্যোগে চিলমারী-রৌমারী নৌপথে ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর কুঞ্জলতা নামের একটি ফেরি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরি চলাচল শুরু হয়। পরে একই বছরের ৪ অক্টোবর বেগম সুফিয়া কামাল নামে আরও একটি ফেরি যুক্ত করা হয়। তবে ধারণক্ষমতা কম হওয়ার অজুহাতে চালুর মাত্র ২৫ দিনের মাথায় (২৯ অক্টোবর) চিলমারী রমনা ঘাট থেকে বেগম সুফিয়া কামাল ফেরিটি সরিয়ে নেয়া হয়। এরপর ২০২৩ সালের নভেম্বরে কদম নামে আরেকটি ফেরি এই নৌপথে যুক্ত হয়।
দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত বিআইডব্লিউটিসি’র দুটি ফেরিতে পণ্যবাহীসহ বিভিন্ন প্রকার পরিবহন পারাপার করে আসছে। শুষ্ক মৌসুমে ব্রহ্মপুত্রের পানি কমে যাওয়ায় নাব্যতা সংকট দেখা দেয়। নিয়মিত চ্যানেল খননের মাধ্যমে নাব্যতা সংকটকে অতিক্রম করে বিআইডব্লিউটিসি নিয়মিতভাবে ফেরিতে পণ্যবাহী গাড়ী পারাপার করে আসছিল।
কুড়িগ্রাম জেলায় অবস্থিত স্থল বন্দর থেকে নৌ পথে ফেরি পারাপারে ঢাকা যেতে সময় এবং আর্থিক সাশ্রয়ের ফলে অতি অল্প সময়ে উত্তরাঞ্চলে পণ্যবাহী পরিবহনের জন্য এই নৌপথ ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এতদিন কুঞ্জলতা ও কদম নামের ফেরি দুটি পণ্যবাহীসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন পারাপার চলছিল। কিন্তু চলতি বছরের ১৪ জুলাই মেরামতের কথা বলে কুঞ্জলতাকে সরিয়ে নেয়ার পর গত ৫১ দিন ধরে কদম নামের ফেরিটিই ছিল এই নৌপথের একমাত্র ভরসা। এবার মেরামতের অজুহাতে সেটিও সরিয়ে নেওয়ায় চিলমারী-রৌমারী নৌপথ এখন সম্পূর্ণ ফেরিশূন্য।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ফেরি চলাচলে সম্পৃক্ত মো: নুরুল আমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনটি ফেরি দিয়ে চিলমারী ঘাট চালু হলেও এখন একটিও নেই। একটি ফেরি মেরামতে পাঠানো হলে বিকল্প ফেরির ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। মেরামত ও নাব্যতা সংকটের অযুহাতে ডকইয়ার্ডে পাঠানোয় চিলমারী-রৌমারীর মানুষের জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে।
নাব্যতা সংকটের কথা তুলে ধরে আরেক এলাকাবাসী সাইদুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নাব্যতা সংকটের কারণে ফেরি চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, তার ওপর একের পর এক ফেরি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প ফেরি না দিলে পণ্য পরিবহন ও মানুষের যাতায়াতে বড় সংকট তৈরি হবে।
চিলমারী-রৌমারী নৌপথটি আন্তর্জাতিক নৌ চ্যানেল তথা এই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌ বাণিজ্যের একটি সম্ভাবনাময় রুট। চিলমারী নদীবন্দরকে ঘিরে বিশাল অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে চললেও বারবার ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই উন্নয়নের সুফল পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। নৌপথের নাব্যতা সংকট নিরসনের পাশাপাশি ‘কদম’ মেরামতে থাকা অবস্থায় অনতিবিলম্বে বিকল্প ফেরি চালুর জোরালো দাবি জানিয়েছেন তারা।
চিলমারী ঘাটে অপেক্ষমান ট্রাকচালক আশরাফুল ইসলাম জানান, ফেরি না থাকলে ঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রহর গুনতে হয়, এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে। দ্রুত ফেরি চালু না হলে এই অঞ্চলের পণ্য পরিবহনে মারাত্মক স্থবিরতা দেখা দেবে।
গতকাল বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) চিলমারী ঘাটে ভুটানের বানিজ্যেক প্রতিনিধি দল কুড়িগ্রামে প্রস্তাবিত ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে সোনাহাট স্থলবন্দর, ধুপরি ও চিলমারী-নারায়ণগঞ্জ নৌবন্দরের যোগাযোগব্যবস্থা, দূরত্ব ও পণ্য পরিবহনের সম্ভাবনা যাচাই করতে তাঁরা বন্দরটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন দলে ছিলেন ভুটানের জিএমসিএর উপপরিচালক (আন্তর্জাতিক ও কৌশলগত বিষয়াদি) কালদেন দর্জি, সহযোগী পরিচালক নিম এলহাম এবং রয়্যাল ভুটানিজ দূতাবাসের মিনিস্টার-কাউন্সিলর (বাণিজ্য) দাওয়া শেরিংসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরিদর্শনকালে তাঁরা বন্দরের অবকাঠামো, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম এবং পণ্য পরিবহনের সম্ভাব্যতা সম্পর্কে খোঁজ নেন।
চিলমারী বন্দরের পোর্ট কর্মকর্তা মাহবুব আলম তায়েফ জানান, কুড়িগ্রামে প্রস্তাবিত ভুটানিজ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে স্থলপথ, নৌ পথ ও রেল পথের কাজে লাগিয়ে কিভাবে ব্যবসা বান্ধব চিলমারীসহ দেশীয় সামগ্রিক অর্থনীতিতে উত্তরবঙ্গকে আরো কিভাবে সমৃদ্ধি আনা যায়। আমাদের এই আন্ডার কনস্ট্রাকশন প্রকল্পটির সার্বিক সুবিধা নিয়ে তারা কিভাবে ইনভেস্ট করবেন। আশার কথা দই খাওয়া থেকে এ পর্যন্ত কোন কাস্টমস ফেসিলিটিস নাই। শুধু চিলমারীতেই প্রথম বারের মতো কাস্টমস ফেসিলিটিস নতুনভাবে স্থাপন হচ্ছে। এটা তাঁরা পজেটিভ সাইন হিসেবে নিয়েছে।
সামগ্রিক ফেসিলেটিসগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে চিলমারী বন্দরের মাধ্যমে বিশাল অংকের বিনিয়োগের দিকে যাবে এই বলে তারা আশ্বস্ত করেছে।
চিলমারী ঘাট ফেরিশূন্য সমন্ধে তিনি জানান, ফেরি চলাচল নির্ভর করে সম্পূর্ণ বিআইডব্লিউটিসির উপরে, বিআইডব্লিউটিসি সচরাচর ফেরি সার্ভিস দিয়ে থাকে। ঘাট ম্যানেজমেন্টসহ বন্দরের সার্বিক কার্যক্রম বিআইডব্লিউটিএ করে থাকে। কিন্তু নৌ পথের নাব্যতা সংকট দূরীকরণে বিআইডব্লিউটিএর পর্যাপ্ত পদক্ষেপ এ পর্যন্ত নেয়া হয়েছে। চিলমারী ঘাটে ড্রেজিং এর জন্য দু-একদিনের মধ্যে ড্রেজার চলে আসবে। আসলে ড্রেজিং ইস্যুটা ও নাব্যতা ইসুটা একটা চলমান প্রক্রিয়া চিলমারী বন্দর ছাড়াও সব রুটেই ড্রেসিং কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
বিআইডব্লিউটিসির চিলমারী নদীবন্দরের সহকারী প্রকৌশলী (বাণিজ্য) আতিক সোহেল আকাশ বলেন, ফেরি কদম মেরামতের জন্য নারায়ণগঞ্জের ডকইয়ার্ডে পাঠানো হয়েছে। মেরামত শেষে ফেরিটি আবার চিলমারী-রৌমারী নৌপথে ফিরিয়ে আনা হবে।
বিআইডব্লিউটিসি’র পরিচালক(বাণিজ্য) এসএম আশিকুজ্জামান বলেন, এখন তো ফেরি বন্ধ আছে, বন্ধ থাকা অবস্থায় জাহাজের ডকিংটা করতে হবে, এজন্য ডকিং করতে আনা হয়েছে। ডকিং শেষ হলে আবার চলে যাবে। ফেরি রানিং থাকলে আনতাম না, যেহেতু ড্রেজিংয়ের জন্য সময় লাগবে তাই এনেছি। ফেরি কুঞ্জলতাকে প্রেরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ওটির কাজ শেষ হয়েছে তবে চ্যানেল ড্রেজিংয়ের কাজ শেষ হলে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলা জানান তিনি।
