
|| অধ্যাপক ড. মো. জাকির হুসাইন ||
একটি জাতির সামগ্রিক সার্বিক অগ্রগতি, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির টেকসই ভিত্তি নির্মাণে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সবচেয়ে শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। পরিবর্তনের ধারায় বাংলাদেশ আজ এক নতুন সম্ভাবনাময় সূচনার সম্মুখীন। ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা গঠন, মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং জাতীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে গুণগত মান নিশ্চিত করার যে যুগান্তকারী মানসিকতা আজ সৃষ্টি হয়েছে, তা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম মূল চালিকাশক্তি। এই ইতিবাচক পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়নের ধারাকে বেগবান রাখতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
ভাটি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জের শিক্ষা ও গবেষণার প্রসারে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (সুবিপ্রবি) একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দুর্গম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর তরুণদের কাছে আধুনিক, সময়োপযোগী ও বৈশ্বিক মানসম্পন্ন প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া এবং দেশের দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টিতে সুবিপ্রবি নিরলসভাবে কাজ করে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের লক্ষ্য শুধু সনদভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া নয়; বরং সুশিক্ষা, নীতি-নৈতিকতা এবং উচ্চমানের গবেষণার সমন্বয়ে এমন এক প্রজন্মের বিকাশ ঘটানো—যারা জাতীয় সংকট ও উদ্ভাবনে মেধার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হবে।
বর্তমান যুগের মূল চ্যালেঞ্জ হলো তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বায়ন এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের সাথে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়া। রাষ্ট্রের সামগ্রিক অগ্রযাত্রার চাকা সচল রাখতে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি থেকে উদ্ভাবিত জ্ঞানকে শিল্প ও সমাজের কল্যাণে সরাসরি প্রয়োগ করতে হবে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন, কৃষি-প্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তির সর্বাত্মক ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় সমস্যাগুলোর কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক সমাধান খুঁজে বের করাই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল দায়িত্ব।
একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়নের মূল উপাদান হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, সুশাসন ও আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা। দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক শ্রমবাজারে স্থান করে নিতে সক্ষম তরুণ প্রজন্ম গঠনে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গবেষণানির্ভর শিক্ষাক্রম, আধুনিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কারিকুলাম সংস্কার এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক গবেষণায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ সম্প্রসারণ আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার।
হাওরাঞ্চলের মতো চ্যালেঞ্জিং ভৌগোলিক অঞ্চলে অবস্থিত সুবিপ্রবিকে আমরা একটি প্রথম সারির বিজ্ঞান ও গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। তরুণ সমাজই এ দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। সততা, দেশপ্রেম, মেধা ও দায়িত্বশীলতার সাথে এই তরুণ শক্তিকে সঠিক পথনির্দেশনা দিতে পারলে যেকোনো কঠিন বাধা অতিক্রম করা সম্ভব।
একটি বৈষম্যহীন, আলোকিত ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনে শিক্ষা ও উদ্ভাবনের এই গতিশীল ধারা অব্যাহত রাখতে শিক্ষার্থী, গবেষক, শিক্ষক ও দেশবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। আসুন, ঐক্যবদ্ধভাবে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে ও প্রযুক্তিগত বিপ্লবে আমরা যার যার অবস্থান থেকে কার্যকর ভূমিকা রাখি।
লেখক: উপাচার্য, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (সুবিপ্রবি)
