মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১০

সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে যমুনার ভাঙন আর তাঁতশিল্পের সংকটে কার পাল্লা ভারী?

মো. আসাদুল ইসলাম
|| আসাদুল ইসলাম | নিজস্ব প্রতিবেদক | আলোকিত দৈনিক ||

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি ও চৌহালী) আসনে বইছে ভিন্নধর্মী এক নির্বাচনী হাওয়া।

সিরাজগঞ্জ জেলার গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ আসন সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী)। একদিকে তাঁত শিল্পের রাজধানী হিসেবে পরিচিত বেলকুচি, অন্যদিকে যমুনার ভাঙনে ক্ষতবিক্ষত চৌহালী। এই দুই বিপরীতধর্মী জনপদের কয়েক লাখ ভোটারের ম্যান্ডেট এবার কার দিকে যাবে, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

১. ভোটার পরিসংখ্যান ও জনতাত্ত্বিক চিত্র

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এই আসনের ভোটার সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ২৬ হাজার ৩২১ জন।

  • পুরুষ ভোটার: ২,১৮,৬৬৪ জন
  • নারী ভোটার: ২,০৭,৬৫৫ জন
  • হিজড়া ভোটার: ২ জন

এবারের নির্বাচনে নারী এবং প্রায় ৩০% নতুন তরুণ ভোটারই প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের মূল কারিগর হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২. মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রার্থীদের তালিকা

বিগত কয়েকটি একতরফা নির্বাচনের পর এবার সব দলের অংশগ্রহণে লড়াই হচ্ছে বহুমাত্রিক। ১১ জন প্রার্থী মাঠে থাকলেও মূল আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে চারজনকে ঘিরে:

প্রার্থীদল / জোটপ্রতীকমূল ভিত্তি
মো. আমিরুল ইসলাম খান (আলিম)বিএনপিধানের শীষদীর্ঘ সময় মাঠ দখল রাখা ও জাতীয় পরিচিতি।
অধ্যক্ষ মো. আলী আলম১১ দলীয় জোট (জামায়াত)দাঁড়িপাল্লাসুসংগঠিত কর্মী বাহিনী ও শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান।
শেখ মুহাম্মাদ নুরুন নাবীইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশহাতপাখাধর্মীয় ভোট ও সুশৃঙ্খল প্রচারণা।
মো. আকবর হোসেনজাতীয় পার্টিলাঙ্গললাঙ্গলের পুরনো ভোট ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি।

৩. নির্বাচনী প্রেক্ষাপট: নদী ভাঙন ও তাঁত শিল্প

সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের লড়াই কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

  • যমুনার ভাঙন (চৌহালী ইস্যু):

চৌহালী উপজেলার প্রধান সমস্যা নদী ভাঙন। গত কয়েক দশকে কয়েক হাজার পরিবার গৃহহীন হয়েছে। ভোটারদের প্রধান দাবি—‘ত্রাণ নয়, টেকসই বাঁধ চাই’। প্রার্থীরা এবার নদী শাসন ও ভাঙন কবলিতদের পুনর্বাসনের গ্যারান্টি দিয়ে ভোট চাইছেন।

  • তাঁত শিল্পের সংকট (বেলকুচি ইস্যু):

বেলকুচি মূলত তাঁত সমৃদ্ধ এলাকা। কাঁচামালের চড়া দাম এবং উৎপাদিত কাপড়ের সঠিক বাজারমূল্য না পাওয়া নিয়ে তাঁতীদের ক্ষোভ চরমে। যে প্রার্থী তাঁতীদের সুরক্ষা ও বাজারজাতকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে পারছেন, ভোটাররা তাদের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন।

৪. তুলনামূলক বিশ্লেষণ: কে কোথায় এগিয়ে?

  • বিএনপি:
    দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর সংসদ নির্বাচনে সক্রিয় হওয়ায় দলটির সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে উদ্দীপনা প্রচুর। আমিরুল ইসলাম খান আলিমের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও দলের রিজার্ভ ভোট তাকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখছে।
  • ১১ দলীয় জোট (জামায়াত):
    জামায়াত প্রার্থী আলী আলমের ব্যক্তিগত স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং শিক্ষা ও সামাজিক কাজে যুক্ত থাকার কারণে সাধারণ মানুষের একাংশ তাকে ‘যোগ্য বিকল্প’ হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে জোটবদ্ধ হওয়ায় তার শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ:
  • বেলকুচি ও চৌহালীর গ্রামাঞ্চলে দলটির একটি সুশৃঙ্খল ও বিশাল ‘রিজার্ভ’ ভোট ব্যাংক রয়েছে। তারা কোনো বড় জোটে না গিয়ে এককভাবে লড়ছে। ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রচারের মাধ্যমে তারা সাধারণ ও নিরপেক্ষ ভোটারদের আকৃষ্ট করছে। বিশেষ করে তরুণ ধর্মপ্রাণ ভোটাররাই তাদের মূল শক্তি।
  • ​জাতীয় পার্টি:
  • এই আসনে জাতীয় পার্টির পুরনো ঐতিহ্য রয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে পুঁজি করে তারা প্রবীণ ভোটারদের মাঝে প্রচারণা চালাচ্ছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায়, তাদের ঘরানার একটি অংশ (যারা বিএনপি বা জামায়াতকে ভোট দিতে বিমুখ) বিকল্প হিসেবে ‘লাঙ্গল’ বেছে নিতে পারে।
  • জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন বড় কোনো চমক দেখাতে না পারলেও মূল দুই প্রার্থীর ভোট ব্যাংকে ফাটল ধরাতে পারে, যা জয়-পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দেবে।

৫. অর্থনীতির প্রভাব

এ এলাকার অর্থনীতি মূলত তাঁত ও কৃষির ওপর নির্ভরশীল। চলমান মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের পরিবর্তনকামী মনোভাব কাজ করছে। ‘আলোকিত দৈনিক’-এর মাঠ পর্যায়ের জরিপ অনুযায়ী, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিশ্বাসযোগ্যতাই হবে এবারের ভোটের তুরুপের তাস।

পরিশেষে বলা যায়, যমুনার উত্তাল স্রোত যেমন চৌহালীর মানচিত্র বদলে দেয়, তেমনি ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট বিপ্লব সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেবে কি না—সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *