
এস.এম.রেদোয়ানুল হাসান
ইসলাম মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শালীনতা, পর্দা ও তাকওয়াকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই আল্লাহ তাআলা এমন বিধান দিয়েছেন, যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের পবিত্রতা রক্ষা করে। সাম্প্রতিক সময়ে মাদরাসা ছাত্রীদের নিয়ে ফুটবল দল গঠনের আলোচনা অনেকের মনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত বিষয়টি আবেগ নয়, বরং কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে বিবেচনা করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে, লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে… তারা যেন তাদের ওড়না বক্ষদেশের ওপর টেনে দেয়।” (সূরা আন-নূর ২৪:৩১)। আবার আল্লাহ বলেন, “হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ ও মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের চাদরের অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদের সহজে চেনা যাবে এবং তারা উত্যক্ত হবে না।” (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৯)।
এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, মুসলিম নারীর জন্য পর্দা, শালীনতা ও নিজের সৌন্দর্য সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন পরিবেশ বা কর্মকাণ্ড, যেখানে এই নীতিগুলো ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা একজন মুসলিমের দায়িত্ব।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা।” (সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)। অন্য একটি হাদিসে তিনি বলেন, “যখন তোমার লজ্জা থাকবে না, তখন যা ইচ্ছা তাই কর।” (সহিহ আল-বুখারি)। এসব হাদিস মুসলিম চরিত্রে লজ্জাশীলতা ও শালীনতার গুরুত্ব স্পষ্ট করে।
ইসলাম শরীরচর্চা বা সুস্থ থাকার বিরোধিতা করে না। বরং শক্তিশালী মুমিনকে দুর্বল মুমিনের তুলনায় উত্তম বলা হয়েছে (সহিহ মুসলিম)। তবে শরীরচর্চা ও খেলাধুলাও ইসলামের নীতিমালার মধ্যে হতে হবে। যদি কোনো খেলায় পর্দা লঙ্ঘিত হয়, অনাবশ্যক প্রদর্শন ঘটে বা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তাহলে অনেক ইসলামি আলেম তা শরিয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য মনে করেন না।
বিশেষ করে মাদরাসা এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা, ইসলামী আদর্শ ও পর্দার পরিবেশ রক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই সেখানে যেকোনো নতুন কার্যক্রম চালুর আগে এই মৌলিক আদর্শের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য বিবেচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা উচিত যে, ইসলামি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন আলেম ও ফকিহ সমসাময়িক বিষয়গুলো নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করতে পারেন।
অতএব, যারা মনে করেন মাদরাসা ছাত্রীদের জন্য ফুটবল দল গঠন পর্দা ও ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে, তাদের উদ্বেগের ভিত্তি কুরআন-সুন্নাহয় বর্ণিত শালীনতা ও পর্দার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। একই সময়ে আলোচনা হওয়া উচিত কীভাবে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও শারীরিক বিকাশ নিশ্চিত করা যায়, এমন উপায়ে যা প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অভিভাবকদের প্রত্যাশার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
মাদরাসা শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো দ্বীনি জ্ঞান, চরিত্র গঠন ও ইসলামী আদর্শ। তাই এ ধরনের যেকোনো নীতি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে কুরআন-সুন্নাহ, দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট আলেম, শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ইসলামী মূল্যবোধ অক্ষুণ্ণ রেখেই শিক্ষার্থীদের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার পথ খুঁজে বের করাই হবে সর্বোত্তম প্রজ্ঞার পরিচয়।
লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী, আল কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া। মেইল:shikderrayhan980@gmail.com
