
|| অলিউল ইসলাম | বেরোবি, রংপুর ||
শিক্ষার্থী সানজানা ইবনাত এক অনুপম নারী উদ্যোক্তার নাম। মেধাবী এ শিক্ষার্থী শুধু ক্লাসরুমের চৌহদ্দিতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি বরং ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠনের কাজের ব্যস্ততার ফাঁকেই তিনি গড়ে তুলেছেন তার নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম আনন্দিতা। নিজ হাতের তৈরি জুয়েলারির জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ‘আনন্দিতা’। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এই শিক্ষার্থী প্রমাণ করেছেন, সঠিক পরিকল্পনা, তীব্র ইচ্ছাশক্তি এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার থাকলে শিক্ষাজীবন ও উদ্যোক্তার স্বপ্ন একই সঙ্গে বহন করা শুধু সম্ভবই নয়, বরং তা এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

শুরুর গল্প: শখ থেকে ব্যবসা, আত্মবিশ্বাসের নতুন যাত্রা
বলা হয়ে থাকে প্রতিটি সফল ব্যবসার পেছনেই থাকে একটি আন্তরিক গল্প। ‘আনন্দিতা’র শুরুটাও ঠিক তেমনই। নিজের হাতে কিছু বানানোর তীব্র শখ থেকেই এর বীজ বপন হয়। সানজানা স্মৃতিচারণ করে বলেন, “ছোটবেলা থেকেই আমার একটু অন্যরকম কিছু করার আগ্রহ ছিল। প্রথমে শখের বশে কয়েকটা ইয়াররিং, ব্রেসলেট বানিয়েছিলাম। এগুলো বন্ধুদের দেখানোর পর তারা খুবই উৎসাহিত করলো। তাদের উৎসাহ এবং আশপাশের মানুষের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াই আমাকে সাহস যোগালো একটি ফেসবুক পেজ খোলার। এরপর ‘আনন্দিতা’ নামে পেজটি খোলার পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি।” শখের কাজটিই এখন তার কাছে কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়, এটি তার চ্যালেঞ্জ, আত্মবিশ্বাসের প্রতীক, এবং সৃজনশীলতার প্রকাশ। এই ব্র্যান্ডটি তাকে এনে দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতির বাইরে আরও বড় এক আত্মমর্যাদা।
সময় ব্যবস্থাপনাই সাফল্যের চাবিকাঠি: ‘অসম্ভব নয় কোনো কাজ’
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি একটি ব্যবসা সফলভাবে পরিচালনা করা, বিশেষ করে এমন একটি শিল্প, যা সম্পূর্ণ সৃজনশীলতা ও শ্রমের উপর নির্ভরশীল, সেটা খুবই কঠিন একটি কাজ। তিনি জানান, “দিনের বেলায় ক্লাস, , অ্যাসাইনমেন্ট আর সংগঠনের কাজের জন্য সময় খুব কম পাই। তাই বেশিরভাগ জুয়েলারি আমাকে রাতেই বানাতে হয়। কখনও কখনও গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়, যাতে পণ্যের গুণগত মান ঠিক রেখে সময়ের মধ্যে অর্ডার ডেলিভারি দেওয়া যায়। আমি বিশ্বাস করি, সময়কে যদি কঠোরভাবে পরিকল্পনা করে ব্যবহার করা যায়, তবে কোনো কাজই অসম্ভব নয়। রুটিন তৈরি করে পড়াশোনা, ঘুম এবং ব্যবসার জন্য নির্দিষ্ট সময় আলাদা করে রেখেছি, আর এটাই আমার সাফল্যের মূল মন্ত্র।
কাঁচামাল সংগ্রহ: মফস্বলের উদ্যোক্তার মূল চ্যালেঞ্জ
হ্যান্ডমেড জুয়েলারি ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গুণগত মানের কাঁচামাল। এখানেই সানজানা রংপুরের একজন উদ্যোক্তা হিসেবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “রংপুরে হ্যান্ডমেড জুয়েলারির জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ ধরনের বিডস, ক্লাস্প, রজন বা ফিনিশিং টুলস-এগুলো সহজে বা পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায় না। এটিই আমার ব্যবসার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।” এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে তাকে নির্ভর করতে হয় ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরের সাপ্লাই চেইনের ওপর। “ঢাকা বা দক্ষিণবঙ্গ থেকে বেশিরভাগ কাঁচামাল আনাতে হয়। এতে পণ্য প্রতি সময় ও খরচ দুটোই বেশি লাগে। কুরিয়ারের দীর্ঘসূত্রতা বা অতিরিক্ত খরচের কারণে কখনও কখনও নতুন ডিজাইনের জন্য অপেক্ষাও করতে হয়, যা ব্যবসার গতিকে শ্লথ করে দেয়। যদি স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সহজলভ্য হতো, তবে ব্যবসা আরও দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারতো,” তিনি যোগ করেন। এই প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, তিনি জুয়েলারির মান নিয়ে কখনোই আপস করেননি, যা তার গ্রাহকদের মধ্যে একটি শক্তিশালী আস্থা তৈরি করেছে।
নারী উদ্যোক্তার সংগ্রাম ও নিরাপত্তা: সতর্কতার এক নতুন মাত্রা
‘আনন্দিতা’র যাত্রা কেবল সৃজনশীলতার নয়, এটি এক নারী উদ্যোক্তার একক সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। ডিজাইন করা, কাঁচামাল বাছাই, প্যাকেজিং থেকে শুরু করে কুরিয়ার করা—প্রতিটি কাজ সানজানা একাই সামলান। ব্যবসার এই একক পরিচালনার ক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তাকে নিরাপত্তার বিষয়টিও বিশেষভাবে মাথায় রাখতে হয়। তার কথায়, “বিশেষ করে বাইরের ডিলিং বা জিনিসপত্র সংগ্রহ করার জন্য মার্কেটে যাওয়া সব সময় সহজ হয় না। অনেক সময় অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। আমাকে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হয়। সবকিছুর জন্য বাইরে বের হওয়া অনেক সময় নিরাপদ বা আরামদায়ক মনে হয় না। মনে হয় ঢাকা বা অন্য কোনো বড় শহরে থাকলে হয়তো সাপ্লাই চেইন এবং নিরাপত্তার কারণে কাজটা আরও সহজ হতো।” এই চ্যালেঞ্জগুলো সানজানার মতো আরও অনেক মফস্বলের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সাধারণ চিত্র। তবুও, তিনি তার উদ্যম ধরে রেখেছেন এবং অন্যান্য তরুণীদের জন্য প্রেরণা জুগিয়েছেন।
‘আনন্দিতা’ নামের সার্থকতা: এক টুকরো ভালোলাগা
ব্র্যান্ডের নাম ‘আনন্দিতা’ দেওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করায় সানজানা ইবনাত লাজুক হেসে বলেন, ” নামটা অনেক ভেবেচিন্তে দিয়েছি। আমার তৈরি গয়না যখন কেউ পরবে, তখন যেন তার মনে এক টুকরো আনন্দ বা ভালো লাগা তৈরি হয়, সেই ভাবনা থেকেই নামটা দিয়েছি।” তার এই ধারণার সার্থকতা তিনি খুঁজে পান গ্রাহকদের প্রতিক্রিয়ায়। আমার প্রথম কাস্টমার যখন মেসেজ করে বললেন, ‘তোমার ডিজাইন করা জিনিসগুলো পরলে মনটাই ভালো হয়ে যায়,’ তখনই বুঝেছিলাম আমি সঠিক পথে আছি। আমার গয়না মানুষের মনে সামান্য হলেও আনন্দ যোগ করতে পারছে—এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না, তিনি জোর দিয়ে বলেন।
পরিবার, প্রতিকূলতা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন
সানজানা ইবনাতের এই কঠিন যাত্রায় পরিবারের সমর্থন পুরোপুরি বাধাহীন ছিল না। তিনি বলেন, “সব সময় সবাই পাশে ছিলো, সেটা ঠিক নয়। অনেক সময় পরিবার বলত, ‘তোমার কি এটা করা দরকার ছিল?’ বা ‘শুধু পড়াশোনাতেই মন দাও।’ সমাজের অনেকেই শুরুতে আমার উদ্যোগকে গুরুত্ব দেয়নি, অনেকে কৌতূহল এবং নেতিবাচক মন্তব্য করেছে। তবুও আমি থেমে থাকিনি। নিজের স্বপ্নের প্রতি বিশ্বাস আর দৃঢ় ইচ্ছাশক্তিই আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।”
পরিবার কখনও সরাসরি বাধা দেয়নি, কিন্তু তাদের সাধারণ উদ্বেগ এবং সামাজিক মনোভাবই তার পথে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই সকল প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে গিয়ে সানজানা শিখেছেন ধৈর্য, আত্মনির্ভরতা এবং সাহসিকতা।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার স্বপ্ন খুব বড়। আমি চাই, ‘আনন্দিতা’ একদিন একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হবে। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশের বাজারেও আমাদের হাতের কাজের জুয়েলারি সমাদৃত হবে।” কেবল নিজের ব্যবসাকে বড় করাই নয়, তিনি চান সামাজিক পরিবর্তন আনতেও। “একদিন আমি একটি ছোট স্টুডিও খুলতে চাই, যেখানে রংপুরের বা মফস্বলের অন্য মেয়েরাও কাজ শিখবে, আয় করবে এবং নিজেদের মতো করে সমাজে নিজেদের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। আমি চাই, ‘আনন্দিতা’ শুধু একটি জুয়েলারি ব্র্যান্ড না হোক, এটি হোক নারী ক্ষমতায়নের একটি প্রতীক।”
সানজানা ইবনাত রংপুরের মতো শহরে বসে দেখিয়ে দিলেন, সৃজনশীলতা, তীব্র ইচ্ছা শক্তি আর আত্মবিশ্বাসের জোরে স্বপ্ন কতটা বড় হতে পারে। তিনি প্রমাণ করলেন, মেধাবী ছাত্রী এবং সফল উদ্যোক্তা—এই দুটি পরিচয়ই একজন মানুষ একই সঙ্গে ধারণ করতে পারে, শুধু প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম এবং নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অদম্য মানসিকতা। তার এই গল্প দেশের হাজারো তরুণ-তরুণীর জন্য এক নতুন প্রেরণা।
লেখক: শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি), রংপুর।
