রবিবার, জানুয়ারি ১১

বাংলাদেশ–ভারত নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সাইডলাইন বৈঠক

বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টার বৈঠক ছিল আলোচিত। বাংলাদেশ–ভারতের সম্পর্কটি হোক বন্ধুত্বের ও একে অপরের সহযোগিতার। কলম্বো সিকিউরিটি (সি এস সি) জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সপ্তম সম্মেলন হওয়ার আগে সাইড লাইন বৈঠক হিসাবে অনুষ্ঠিত দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টার মধ্যে বৈঠক।

খলিল–দোভাল-এর মধ্যে সাইড লাইন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া বৈঠকটি যা সকাল ১১টার দিকে শুরু হয়। ৪৫ মিনিট স্থায়ী বৈঠকটি ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ভারত বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু হলেও সম্পর্কের জায়গাটিতে বেশকিছু অপ্রত্যাশিতভাবে সম্পর্কের জায়গায় জট বেঁধেছে। ভারত বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু রাষ্ট্র সেটি মনে হয় মানতে বা বলতে কোনো দ্বিধা নেই।

কলম্বো সিকিউরিটি (সি এস সি) জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সপ্তম সম্মেলন। এই জোটের সদস্য দেশসমূহকে নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সপ্তম সম্মেলন। আমাদের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান এই সম্মেলনে যোগ দিতে দিল্লি গেছেন। এই আয়োজনে ভারত–বাংলাদেশ ছাড়াও অংশ নিচ্ছে সদস্য রাষ্ট্র মালদ্বীপ, মরিশাস ও শ্রীলঙ্কা; পর্যবেক্ষক হিসাবে থাকছে সিশেলস। এই আঞ্চলিক নিরাপত্তা ফোরাম সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, সন্ত্রাস ও চরমপন্থা প্রতিরোধ, মানব পাচার ও আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, সাইবার নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও প্রযুক্তির সুরক্ষা, মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগে ত্রাণ সহায়তায় কাজ করে।

অজিত দোভালকে ঢাকা সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন খলিলুর রহমান। এটি দুই দেশের সম্পর্কের জন্য একটি ইতিবাচক দিক। এই সম্মেলন উপলক্ষে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। বুধবারের আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দিল্লি পৌঁছান ড. খলিলুর রহমান।

গত এপ্রিলে ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠক করেছিলেন অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ওই বৈঠকের পর দিল্লিতে খলিলুর রহমানের সঙ্গে অজিত দোভালের বৈঠকটি দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের প্রথম বৈঠক। দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এই বৈঠকে। ১৫ মাস ধরে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি, স্থিতিশীলতাসহ বাংলাদেশের জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থের বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে আমরা সবসময় সব অংশীজনের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে যুক্ত থাকব।

ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সুস্পষ্টভাবে বলেছেন ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন চায় না। দোভালকে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ–ভারতের মধ্যে সুসম্পর্ক যত গভীর হবে সেটির প্রভাব ব্যবসা–বাণিজ্যের মধ্যে পড়বে। আমরা একে অপরের উপর নির্ভরশীল। এই বৈঠকের পটভূমি ছিল বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ককে কীভাবে গতিশীল করা যায়। বন্ধুত্বের সম্পর্ক যত মধুর হবে তার ফল ভোগ করবে দুই দেশের জনগণ। বৈরীতা কখনও সুফল বয়ে আনতে পারে না। বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছেন ভারত যে বাংলাদেশে স্বার্থকে সম্মান করবে। কূটনীতির ক্ষেত্রে আফগান সরকার বেশ অগ্রগতি লাভ করেছে। আফগান শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী আলহাজ নূরউদ্দিন আজিজ নয়া দিল্লি সফর করছেন শুধুমাত্র সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য। আফগানিস্তান তার উন্নয়নে সর্বপ্রকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, সেটি একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পাশে ছিল ভারত। ইন্দিরা গান্ধী বা মিসেস গান্ধী যে অবদান রেখেছেন সেটি কোনো অংশে কম নয়। গত ১৯ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর জন্মদিন। তাঁকে স্মরণ করে কিছু কথা না বললে নয়। কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাঁকে সম্মান করতে চাই। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ নাম দিয়েছিলেন প্রিয়দর্শিনী। বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের প্রধানদের কাছে পরিচিত ছিলেন মিসেস গান্ধী হিসেবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা যাবে না। মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার। মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে আমাদের যাত্রা।

ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কন্যা। তিনি ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এবং পুনরায় ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৮৪ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই পদে ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। ১৯১৭ সালের ১৯ নভেম্বর নেহরু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। সন্তান রাজীব গান্ধী ও সঞ্জয় গান্ধী। রাজীব পরবর্তী কালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সমর্থন দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জরুরি অবস্থা ১৯৭৫ সালে ভারতে জরুরি অবস্থা জারি করার জন্য তিনি সমালোচিত হয়েছিলেন। অপারেশন ব্লু-স্টার ১৯৮৪ সালে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনের জন্য “অপারেশন ব্লু-স্টার” পরিচালনা করেন, যা তাঁর হত্যার কারণ হয়। ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর তাঁর ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের দ্বারা তিনি নিহত হন। বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে যে মানুষটি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে গেছেন, হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে বসে থাকতে হয়েছে সাক্ষাতের জন্য। সহ্য করতে হয়েছে অনেক অপমান এই অকৃত্রিম বন্ধুকে। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ভারতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই মানুষটির অবদান কিন্তু কোনো অংশে কম নয়। যাদের নিয়ে এই আলোচনা শুরু করেছি তাদের সম্পর্কে পাঠকের কাছে কিছু তথ্য উপস্থাপন করতে চাই।

অজিত কুমার দোভাল, কেসি, পিপিএম (জন্ম: ২০ জানুয়ারি ১৯৪৫) তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ)। তিনি কেরালা ক্যাডারের গোয়েন্দা ব্যুরো (আইবি) প্রধান এবং ভারতীয় পুলিশ সেবা (আইপিএস) অফিসার ছিলেন। গুপ্তচর এবং গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে তাঁর অপারেশনের মধ্যে রয়েছে অপারেশন ব্ল্যাক থান্ডার ১৯৮৮, ইরাকে ৪৬ জন ভারতীয় নাগরিককে উদ্ধার করা, ২০১৫ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে নাগাল্যান্ড জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অপারেশন।

বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমান একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশি কূটনীতিক এবং অর্থনীতিবিদ। প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি। প্রাক্তন শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়। রাজনীতি ও কূটনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। উত্তেজনা থাকতেই পারে কিন্তু বন্ধুত্বকে বাদ দিয়ে নয়। আমরা এগিয়ে যেতে চাই।

পরিবর্তনশীল রাজনীতিতে পরিবর্তনকে মেনে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। প্রস্তুতি নিতে হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে কাজের মাধ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। মার্কিনপন্থী কূটনীতি, চীনপন্থী কূটনীতি আর সেই সাথে যুক্ত হয়েছে রাশিয়ার কূটনীতির প্রবেশ। সাংহাই সম্মেলন অনেকটা মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে যা আমাদের কাছে চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এশিয়া মহাদেশে রাশিয়া–চীনের কূটনৈতিক প্রবেশ কিছুটা হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ভাবিয়ে তুলেছে। ভারত–আফগান পথচলা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বেশ গুরুত্ব বহন করে। দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়া ও চীন এক নতুন যুগের সূচনা করেছে, ধারা শুরু করতে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *