
|| আন্তর্জাতিক ডেস্ক ||
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর সদ্য গঠিত নতুন সরকারের একটি নীতিগত সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় সরকারের তরফ থেকে গবাদিপশু কেনাবেচার ওপর কড়া বিধিনিষেধ জারি করায় রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বিশেষ করে সরকারি কয়েকটি নির্দিষ্ট দপ্তর থেকে গবাদিপশুর বয়স ও শারীরিক সক্ষমতার শংসাপত্র (ফিটনেস সার্টিফিকেট) ছাড়া কোনো পশু কেনাবেচা করা যাবে না বলে যে কড়া নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে রাজ্য রাজনীতি এখন সম্পূর্ণ উত্তাল। পবিত্র ঈদুল আজহার ঠিক আগে এমন এক নির্দেশিকা জারি হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের পশুর হাটগুলোতে এক অভূতপূর্ব অচলাবস্থা ও স্থবিরতার সৃষ্টি হয়েছে।
গরু কেনাবেচার ওপর এই আকস্মিক নিষেধাজ্ঞার কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন গ্রামীণ এলাকার সাধারণ গরুপালকেরা, যাদের একটি বড় অংশই সনাতন ধর্মাবলম্বী কৃষক। উৎসবের মুখে পশু বিক্রির বাজার হঠাৎ থমকে যাওয়ায় মাথায় হাত পড়েছে হাজার হাজার প্রান্তিক কৃষকের। উদ্ভূত এই পরিস্থিতি যে খোদ শাসক দলকেও কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলেছে, তা মেনে নিচ্ছেন দলের ভেতরে থাকা সংখ্যালঘু নেতারাই। উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার প্রভাবশালী সংখ্যালঘু নেতা তথা দলীয় পদাধিকারী ইউনুস আলী অকপটে স্বীকার করেছেন, এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত দলকে কিছুটা রাজনৈতিক সমস্যায় ফেলেছে। তবে চাষবাস ও জমি কেনাবেচার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এই নেতা আশা প্রকাশ করেছেন, আসন্ন উৎসবের আগেই দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব পরিস্থিতি সামলে নিতে সক্ষম হবে।
গ্রামীণ অর্থনীতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে এই নেতা জানান, বাংলায় মূলত হিন্দু সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে গোপালক ঘোষেরা গরুকে পরম যত্নে লালন-পালন করেন এবং দুধ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু একটা সময়ের পর গরুর বার্ধক্যজনিত কারণে কিংবা নিজেদের জরুরি আর্থিক প্রয়োজনে তাঁরা সেই গরু বিক্রি করে দেন, যা সাধারণত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা কেনেন। এই চিরাচরিত চেইনটি বুঝতে ভুল হওয়ার কারণেই বর্তমানে মাঠপর্যায়ে এক ধরণের বিভ্রান্তি ও জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি মনে করছেন।
এদিকে সরকারের এই নতুন নির্দেশিকাকে হাতিয়ার করে রাজপথে জোরালো আন্দোলনে নেমেছে প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস। দলের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, গরু কেনাবেচার ওপর এমন অযৌক্তিক বিধিনিষেধ আরোপ করে আসলে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, এর ফলে গ্রামগঞ্জের পশুর হাটগুলোতে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং গবাদিপশুর বৈধ ব্যবসা প্রায় বন্ধের মুখে। বিরোধী শিবিরের স্পষ্ট দাবি, একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা হলেও কার্যত এর চোট লেগেছে জাতিধর্ম-নির্বিশেষে সব গরিব মানুষের গায়ে। কারণ এই গ্রামীণ ব্যবসার সঙ্গে যেমন ঘোষ বা দাস সম্প্রদায়ের মানুষ যুক্ত, তেমনই গভীরভাবে যুক্ত মুসলিম সম্প্রদায়ও।
পার্লামেন্টের বিভিন্ন তথ্য ও পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে বিরোধী এই সাংসদ আরও অভিযোগ তুলেছেন, একদিকে দেশ থেকে বিপুল টাকার মাংস বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে এবং করপোরেট সংস্থা থেকে দলীয় তহবিলে বড় অংকের অনুদান আসছে, অন্যদিকে রাজ্যের সাধারণ ও গরিব মানুষের পেটে লাথি মারা হচ্ছে। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়, সবখানেই এখন এই বিতর্ক তীব্র রূপ ধারণ করেছে। ক্যামেরার সামনে এসে অনেক হিন্দু গোপালক ও তাদের পরিবারের নারীদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে এবং কাঁদতে দেখা যাচ্ছে, যাঁরা প্রতি বছর এই নির্দিষ্ট সময়ে গরু বিক্রি করে কৃষিঋণ ও বিভিন্ন মাইক্রোক্রেডিট সংস্থার সাপ্তাহিক ধার মেটাতেন। ঋণের বোঝা কীভাবে শোধ করবেন তা ভেবে দিশেহারা হয়ে অনেকে চরম পথ বেছে নেওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করছেন।
এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেও অবশ্য শেষ মুহূর্তে আশার আলো দেখছেন শাসক দলের একাংশ। দলের স্থানীয় স্তরের নেতারা মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত সমাধান সূত্র বেরিয়ে আসবে। তবে গ্রামীণ স্তরে যে স্থানীয় মানুষের চরম ক্ষোভ ও চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে, তাও অকপটে স্বীকার করে নিচ্ছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। এখন দেখার বিষয়, আসন্ন বড় উৎসবের মরশুম শুরু হওয়ার আগেই রাজ্য সরকার এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট মোকাবিলায় কী ধরণের নমনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
