রবিবার, এপ্রিল ১২

নাগেশ্বরী সেন্ট্রাল ক্লিনিকে ডা. আমজাদ হোসেনের ভুল অস্ত্রোপচারে নারীর মৃত্যু‎‎

|| রফিকুল ইসলাম | নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি ||‎‎

নাগেশ্বরী সেন্ট্রাল ক্লিনিকে সার্জারি ডাক্তার আমজাদ হোসেনের ভুল অস্ত্রোপচারে দুই সন্তানের জননী আরিফা আক্তার মিষ্টি (২৫) নামে এক নারীর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ক্লিনিক বন্ধ করে গা ঢাকা দেয়। অপরদিকে নাগেশ্বরী থানা প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

এদিকে নিহত আরিফা আক্তার মিষ্টির লাশ দক্ষিণ বালাসীপাড়্রা তার বাবা ফারুক হোসেন আপেলের বাড়ির আঙিনায় (১২এপ্রিল) সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত রেখে ৬লাখ টাকায় রফাদফায় অবশেষে তার স্বামীর বাড়িতে মিষ্টিকে দাফন করা হয়েছে।

‎নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার বেরুবাড়ী ইউনিয়নের বেরুবাড়ী (ফারাসকুড়া) গ্রামের আলমগীর হোসেনের স্ত্রী আরিফা আক্তার মিষ্টির প্রসব ব্যাথা উঠলে গত ২৩মার্চ নাগেশ্বরী সেন্ট্রাল ক্লিনিকে নেয়ার পর সেদিনই দিবাগত রাত সাড়ে ১০টায় সিজারিয়ান অপারেশন করেন রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সার্জারি ডাক্তার আমজাদ হোসেন (গাইনি ডাক্তার না হয়েও এবং সহকারী অধ্যাপক (সার্জারি বিভাগ) রংপুর মেডিকেল কলেজের ভুয়া পদবী দিয়ে)। তবে নবজাতক ছেলে সন্তান সুস্থ রয়েছেন।

সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে, মিষ্টির সিজারিয়ান অপারেশনকালে সার্জারি ডাক্তার আমজাদ হোসেন তার পেট থেকে প্লাসেন্টা (ফুল) বাহির না করে ভিতরে রেখে সিলাই শেষে রোগীকে বেঁটে শোয়ায়। সিজারিয়ানের সপ্তাহ-খানেক পরে স্বামীর বাড়িতে মিষ্টির অসহ্য পেটের ব্যাথা ও প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হলে সেন্ট্রাল ক্লিনিকে নিয়ে এসে দুই ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়।

এদিকে মিষ্টির অবস্থা অবনতি হলে ডাক্তার আমজাদ হোসেনের নিয়ন্ত্রণে গত ০৭এপ্রিল রংপুর প্রাইম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করান এবং গত ১০এপ্রিল পুনরায় মিষ্টিকে অস্ত্রোপচার করে তার পেট থেকে প্লাসেন্টা (ফুল) বাহির করে।

প্রাইম মেডিকেলে রোগীর অবস্থা ভীষণ অবনতি হলে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয় এবং লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় গত ১১এপ্রিল দিবাগত রাত ১২টায় মিষ্টির মৃত্যু হয়।

অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টিএসও সুজন সাহা মোটা অংকের অর্থ নিয়ে ডাক্তার এবং ক্লিনিকের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করার আজও যদি কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

নিহত আরিফা আক্তার মিষ্টি নাগেশ্বরী পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ড দক্ষিণ বালাসীপাড়্রা গ্রামের ফারুক হোসেন আপেলের মেয়ে। মিষ্টি সাড়ে তিন বছরের কন্যা সন্তান আসফিয়া আক্তার ও নবাগত পুত্র সন্তান রেখে মারা যান।

তথ্য ‎সংগ্রহকালে (১২ এপ্রিল) সেন্ট্রাল ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকে তালা ঝুলানো এবং মৃত স্বজনের আহাজারিতে শোকের ছায়া নামাসহ ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে নাগেশ্বরী থানার কয়েকজন পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। রিপোর্টারের পরিচয় পেয়ে কর্মরত স্টাফরা রুমে আত্মগোপন করেন।

‎নিহতের বাবা ফারুক হোসেন আপেল বলেন, সেন্টাল ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারেশন গাইনি ডাক্তার দ্বারা করার কথা থাকলেও অতি-গোপনে সার্জারি ডাক্তার আমজাদ হোসেনকে দিয়ে ভুল অপারেশন করার কারনে আমার মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। আমি এর বিচার দাবি করছি।

‎নিহতের স্বামী আলমগীর হোসেন বলেন, সেন্ট্রাল ক্লিনিকের স্বত্বাধিকারী রাশেদ হোসেন ও আখের আলীর অবহেলা এবং গাইনি ডাক্তারের নাম বলে সার্জারি ডাক্তার আমজাদ হোসেনকে দিয়ে আমার স্ত্রীর অপারেশন করান। কিন্তু অপারেশনকালে মিষ্টির পেট থেকে প্লাসেন্টা (ফুল) বাহির না করে ভিতরে রেখে সিলাই করে। এরপর আমার স্ত্রীর অসহ্য পেটে ব্যথা ও প্রচুর রক্তক্ষরণে প্রাইম মেডিকেলে দ্বিতীয় অপারেশনের পর লাইফ সাপোটে আমার স্ত্রীর মৃত্যু হয়। তবে আমার নবজাতক পুত্র সন্তান সুস্থ রয়েছে।

‎সেন্ট্রাল ক্লিনিকের স্বত্বাধিকারী রাশেদ হোসেন ও আখের আলী বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোলায়মান আলীর সভাপত্বিতে ও হাফিজুর রহমান মোখতারের মাধ্যমে ৬লাখ টাকা জরিমানা দিয়ে আপস হয়েছে। তবে আজ থেকে ক্লিনিক আর চালাবো না। ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালু থাকবে।

‎রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সার্জারি ডাক্তার আমজাদ হোসেন বলেন, যা হবার তা তো হয়ে গেছে। নিউজ না করতে অনুরোধ জানান।

‎নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টিএসও সুজন সাহা বলেন, আমি ঢাকায় রয়েছি। খোঁজখবর নিয়ে বিষয়টি দেখছি।

‎কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন ডাঃ স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, স্বাস্থ্য দপ্তর রংপুর বিভাগীয় পরিচালক বিষয়টি খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

‎স্বাস্থ্য দপ্তর রংপুর বিভাগীয় পরিচালক গাউসুল আজম চৌধুরী বলেন, রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সার্জারি ডাক্তার আমজাদ হোসেন। তবে তিনি গাইনি ডাক্তার না এবং সহকারী অধ্যাপক (সার্জারি বিভাগ) তার কোন পদবী নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *