Friday, August 14

ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ, খুলনায় ২৪ ঘণ্টায় দুইজনের মৃত্যু

|| শেখ শাহরিয়ার | জেলা প্রতিনিধি (খুলনা) ||

ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে থাকায় খুলনায় চিকিৎসা ও প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৭৫ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে খুলনা জেলাতেই ভর্তি হয়েছেন ৪০ জন।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয় থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেন খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. মোশাররফ হোসেন।

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ভর্তি হওয়া ৭৫ জনের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৫৩ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২২ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া দুইজনই খুলনা জেলার বাসিন্দা।

জেলাভিত্তিক হিসাবে গত এক দিনে খুলনায় সর্বোচ্চ ৪০ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বাগেরহাটে ভর্তি হয়েছেন ২৮ জন। এছাড়া নড়াইলে ৪ জন, মেহেরপুরে ২ জন এবং কুষ্টিয়ায় একজন নতুন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

চলতি বছরের শুরু থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত খুলনা বিভাগে মোট ৩ হাজার ১৯১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৭৭৭ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩৬৫ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া উন্নত চিকিৎসার জন্য ৩৭ জন রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এ বছর এখন পর্যন্ত খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুতে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৯ জন। খুলনা জেলায় আরও দুইজন এবং বাগেরহাটে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, নগরীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে নতুন করে ৪৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছর খুলনা জেলায় এখন পর্যন্ত ৭৫৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৬১৯ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে ১৩৭ জন হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

সরেজমিনে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। রোগীর চাপ বাড়ায় অনেকে শয্যা না পেয়ে হাসপাতালের বারান্দাসহ বিভিন্ন স্থানে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক শিশুর স্বজন আয়েশা জানান, তার মেয়ের বয়স ১২ বছর। কয়েকদিন আগে হঠাৎ তার শরীরে ১০২ থেকে ১০৩ ডিগ্রি পর্যন্ত জ্বর ওঠে। পরে পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। বর্তমানে শিশুটি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চতুর্থ তলায় চিকিৎসাধীন।

তিনি বলেন, জ্বরের পাশাপাশি মেয়েটি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতেও কষ্ট হচ্ছে। সন্তানকে নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছি।

এদিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুধু নগরীতেই সীমাবদ্ধ নেই, উপজেলার বিভিন্ন এলাকাতেও রোগী বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে রোগীদের বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখার পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়েও পরীক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাসপাতাল চত্বর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা নিয়মিত বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করছেন এবং আক্রান্ত রোগীদের বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে খুলনা সিটি করপোরেশনও বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মশা নিধন কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে।

কেসিসির জরুরি সভায় নগরীকে তিনটি জোনে ভাগ করে বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১, ২, ৩, ৫, ১০, ১২, ১৫ ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠন করা হয়েছে জোন-এ। ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২৪, ২৫, ২৬ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে জোন-বি এবং ২১, ২২, ২৩, ২৮, ২৯, ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডকে জোন-সি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

কেসিসি সূত্রে জানা গেছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষভাবে মশা নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি ফগার ও স্প্রে ফগিং বাড়ানো হয়েছে।

নাগরিকদের সচেতন করতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত এবং গির্জার ফাদারদের মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় লিফলেট বিতরণ করা হবে।

এ ছাড়া বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও জানিয়েছে কেসিসি।

স্বাস্থ্য বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বাড়ির আঙিনা, ছাদ, ফুলের টব, ড্রাম, টায়ারসহ যেখানে পানি জমে থাকতে পারে, সেসব স্থান নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *