
|| মো. আছিবুল ইসলাম | বানারীপাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি ||
বরিশাল জেলা প্রশাসনের আয়োজনে পালিত হলো ‘জুলাই পুনর্জাগরণ অনুষ্ঠানমালা-২০২৫’। মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) বরিশাল শিল্পকলা একাডেমির হলরুমে আয়োজিত এই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানে জুলাই গণআন্দোলনের শহিদ পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। দিনব্যাপী আয়োজনে আলোচনা সভা ও একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনও ছিল অন্যতম আকর্ষণ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার মো. রায়হান কাওছার (অতিরিক্ত সচিব)। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এবং বিভাগীয় পুলিশ সুপার। সভাপতিত্ব করেন বরিশালের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব দেলোয়ার হোসেন।
আহত আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে বানারীপাড়ার সন্তান মাসুম বিল্লাহ আলোচনায় অংশ নিয়ে তুলে ধরেন সংগ্রামের পেছনের ত্যাগ-তিতিক্ষা, ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ এবং একটি সম্মানজনক জীবনের প্রয়োজনীয়তা। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, “আমরা যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলাম, তাদের একমাত্র প্রত্যাশা, সম্মানজনক কর্মজীবন। আমরা কোনো ধরনের কোটাভিত্তিক সুবিধা চাই না। চাই এমন একটি সিস্টেম, যেখানে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সব নাগরিকের জন্য সুযোগ থাকবে।
মাসুম বিল্লাহ রাষ্ট্রের প্রতি আরো আহ্বান জানান, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী আহত যোদ্ধাদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও সনদ প্রদানের। তার মতে, এই ইতিহাস শুধু মুখে মুখে নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লিপিবদ্ধ করা প্রয়োজন, যেন আগামী প্রজন্ম সত্য ঘটনাপ্রবাহ জানতে পারে এবং অনুপ্রাণিত হতে পারে। তিনি বলেন, “আজও সাধারণ মানুষের সেবা পেতে হয় তদবির আর দালালচক্রের মাধ্যমে। নাগরিকদের মৌলিক সেবা পাওয়ার এই প্রক্রিয়া যেন এক অভিশাপ। রাষ্ট্রের উচিত এসব অন্যায় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।”
আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি বলেন, “যারা একসময় অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়ছিলেন, তারা আজ আন্দোলনের নাম ভাঙিয়ে ধনসম্পদের পাহাড় গড়েছেন। এর ফলে প্রকৃত যোদ্ধারা হারিয়ে যাচ্ছেন অবহেলার অন্ধকারে। এই বৈষম্য আন্দোলনের চেতনার পরিপন্থী। জনগণের শক্তিকে সংগঠিত রেখে দুর্নীতি, অন্যায় ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সদা প্রস্তুত থাকতে হবে। যদি দেশ সত্যিকারভাবে এগিয়ে যেতে চায়, তবে এই চেতনার ধারকদের পাশে দাঁড়াতেই হবে।”
বিশ্ব রাজনীতির প্রসঙ্গে ফিলিস্তিন সংকট নিয়ে বক্তব্য দেন মাসুম। তিনি মনে করেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ফিলিস্তিনি জনগণের পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি মানবিক রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের উচিত তাদের প্রতি আরও সরব ও সহানুভূতিশীল ভূমিকা পালন করা।
তার বক্তব্যে মুগ্ধ হন উপস্থিত শ্রোতা-দর্শকরা। অনেকের মতে, মাসুম বিল্লাহর কণ্ঠে ফুটে উঠেছে সাধারণ মানুষের না বলা যন্ত্রণা, চাপা কষ্ট আর হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের প্রতিধ্বনি। তার বক্তব্য হৃদয় ছুঁয়ে গেছে উপস্থিত অনেকের মন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে জুলাই আন্দোলনের শহিদ ও আহতদের স্মরণে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজকেরা মনে করেন, এই আয়োজন শুধুই আনুষ্ঠানিকতা নয়—এটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের ইতিহাসচর্চা, যেখানে ত্যাগ ও আত্মবলিদান যথার্থ মর্যাদা পায়।
