মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ১০

খুলনা ২ আসনে দীর্ঘ বিরতির পর ত্রিমুখী লড়াই

|| শেখ শাহরিয়ার | জেলা প্রতিনিধি (খুলনা) ||

বিএনপির ঘাঁটিতে জামায়াতের চ্যালেঞ্জ, ভোটের মাঠ জমজমাট:

বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত খুলনা সদর ও সোনাডাঙ্গা এলাকা নিয়ে গঠিত খুলনা–২ সংসদীয় আসনে এবারের নির্বাচন ঘিরে নতুন উত্তাপ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন পর অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হতে যাওয়ায় ভোটের মাঠে বাড়ছে কৌতূহল ও হিসাব-নিকাশ।

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনগুলোতে ধারাবাহিকভাবে এই আসনে বিএনপির প্রার্থীরাই জয়ী হয়েছেন। এমনকি ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও খুলনা–২ আসনে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বিজয়ী হন। খুলনার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় নজরুল ইসলাম মঞ্জু জনপ্রিয় নেতা হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১৮ বছর পর এই আসন পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যেই বিএনপি আবারও তাকে প্রার্থী করেছে। তবে রাজনৈতিক সমীকরণ অনুকূলে থাকলেও নির্বাচনটি তার জন্য একেবারে সহজ নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই আসনে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন খুলনা সিটি করপোরেশনের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল। মর্যাদার আসন হিসেবে পরিচিত খুলনা সদর এলাকায় জয় পেয়ে রাজনৈতিক চমক দেখাতে চায় দলটি। পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহানগর সভাপতি মুফতি আমানুল্লাহও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। তিন প্রার্থীর সক্রিয় প্রচারণায় নগরজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা গেছে। খুলনার ছয়টি আসনের মধ্যে তুলনামূলকভাবে কমসংখ্যক প্রার্থী থাকায় এই আসনে প্রতিযোগিতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

খুলনা মহানগরীর ১৬ থেকে ৩১ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত খুলনা–২ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩১ হাজার ১৫৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬২ হাজার ৯৭৬ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৬৮ হাজার ১৬৯ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১০ জন। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, কারাগারে থাকা নিবন্ধিত ১ হাজার ৩০০ ভোটার পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন।

এই আসনে ভোট গ্রহণের জন্য ১৫৭টি কেন্দ্র ও ৬৫৭টি ভোটকক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে। পুলিশের ঝুঁকি মূল্যায়নে ১৯টি কেন্দ্রকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৮৬টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ মোট কেন্দ্রের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

অতীত নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এম এ বারী এই আসন থেকে নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে মুসলিম লীগের খান এ সবুর, ১৯৮৬ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী এ ইউ আহম্মদ বিজয়ী হন। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপির শেখ রাজ্জাক আলী, ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়া এবং ২০০৮ সালে নজরুল ইসলাম মঞ্জু এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জয়ী হন, যার মধ্যে দুটি নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেছিল।

প্রায় ১৬ বছর পর এবার খুলনা–২ আসনে বাস্তব প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিন প্রার্থীই ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও ভদ্র মানুষ হিসেবে পরিচিত হলেও মূল লড়াই সীমাবদ্ধ হয়ে আসছে বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও জামায়াতের শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালের মধ্যে।

হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, তিন প্রার্থীই স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন। নজরুল ইসলাম মঞ্জু এলএলবি, শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল এমএসএস এবং মুফতি আমানুল্লাহ এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পেশাগতভাবে নজরুল ইসলাম মঞ্জু ব্যবসায়ী, শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল আইনজীবী এবং মুফতি আমানুল্লাহ শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত। পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে নজরুল ইসলাম মঞ্জুর বিরুদ্ধে ১১টি এবং শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা থাকলেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সেগুলোতে তারা অব্যাহতি পেয়েছেন।

নির্বাচনী মাঠে বিএনপি ইতোমধ্যে সাংগঠনিক বিরোধ মিটিয়ে প্রতিটি ওয়ার্ডে সমন্বিত নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছে। দলীয় নেতাকর্মীরা নিয়মিত গণসংযোগ চালাচ্ছেন। অন্যদিকে জামায়াতও প্রতিটি ওয়ার্ডে নারী ও পুরুষ কর্মীদের পৃথক টিম গঠন করে জোরালো প্রচার চালাচ্ছে। সব মিলিয়ে আসনটিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস স্পষ্ট।

বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, খুলনা শহর ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি। অতীতের প্রতিটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে এখানকার মানুষ বিএনপির ওপর আস্থা রেখেছেন। তিনি দাবি করেন, খুলনার বড় বড় অবকাঠামোগত উন্নয়নের সূচনা বিএনপির সময়েই হয়েছিল। বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে এবারও ভোটাররা বিএনপিকেই বেছে নেবেন বলে তিনি আশাবাদী।

অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা দলগুলোর কাছ থেকে মানুষ প্রত্যাশিত সেবা পায়নি। তার দাবি, নিরাপদ, চাঁদাবাজ ও দখলমুক্ত এবং কর্মমুখর খুলনা গড়তে মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেবে।

খুলনা–২ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আ স ম জামশেদ খোন্দকার জানান, নির্বাচনী পরিবেশ এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ রয়েছে। ভোট গ্রহণ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিপুল সংখ্যক ভোটার কেন্দ্রে এসে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *