শনিবার, ফেব্রুয়ারি ৭

ক্ষমতা বদলায়, খোলসও বদলায়: তদবিরসিন্ডিকেটে নতুন খোলসে পুরনো মুখ

|| গাজীপুর প্রতিনিধি ||

রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল স্থাপনাগুলোর একটি- হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। অথচ সেই বিমানবন্দরই দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও বদলায়নি সেই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার চরিত্র- বরং বদলেছে কেবল রাজনৈতিক খোলস।

বিমানবন্দরের ট্রাফিক সেকশনের সহকারী ব্যবস্থাপক সরোয়ার্দীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, বর্তমানে তিনি নিজেকে বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের ব্যক্তিগত একান্ত সচিব ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রহমান সানির ‘ভাইরা ভাই’ পরিচয় উপস্থাপন করে বিমানবন্দরে একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করছেন। এই পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি টরেন্টো ফ্লাইটের সুপারভাইজারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেও বহাল রয়েছেন বলে জানা গেছে।

সূত্রমতে, ওই ফ্লাইটকে ঘিরে অবৈধ ভিসার মাধ্যমে মানব পাচার চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে- যা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরোয়ার্দীর এই প্রভাব বিস্তারের ইতিহাস নতুন নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজধানীর মিরপুর এলাকার (ঢাকা-১৬) সাবেক আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে পুঁজি করে তিনি বিমানবন্দরের ট্রাফিক সেকশনে একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করেন। ওই সময় নিয়োগ, বদলি, ডিউটি রোস্টার ও গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং ঘিরে গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী তদবির সিন্ডিকেট, যার অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে সরোয়ার্দীর নাম প্রকাশ্যে আসতে থাকে।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে বছরের পর বছর তিনি নির্বিঘ্নে তদবির বাণিজ্য চালিয়ে গেলেও রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে কখনো কার্যকর তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অভিযোগগুলো চাপা দিতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মহলের। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাতারাতি রাজনৈতিক অবস্থান বদলে নিজেকে বিএনপি ঘরানার ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি ফের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ঢুকে পড়েন। এই নতুন পরিচয় ব্যবহার করেই জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (গ্রুপ-৫) পদ থেকে বিতর্কিতভাবে এক লাফে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার (গ্রুপ-৬) পদে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন।

প্রশাসনের অভ্যন্তরে এই পদোন্নতিকে ‘পুরস্কারমূলক রাজনৈতিক পদোন্নতি’ হিসেবে দেখছেন অনেকেই। বর্তমানে বিমানবন্দর শাখা শ্রমিক দলের সভাপতি ফিরোজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে তার প্রত্যক্ষ শেল্টারে সরোয়ার্দী আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সূত্র জানায়, শ্রমিক সংগঠনের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে তিনি বিমানবন্দরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নিজের নিয়ন্ত্রণে ভাগ করে দিচ্ছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করছেন। একাধিক কর্মচারীর অভিযোগ, “ডিউটি রোস্টার, ভালো পোস্টিং- সবকিছুরই নির্ধারিত মূল্য আছে। টাকা না দিলে শাস্তিমূলক ডিউটি, অপ্রয়োজনীয় বদলি কিংবা নানাভাবে হয়রানি করা হয়।”

এমনকি বিদেশি স্টেশনে কর্মরত বাংলাদেশ বিমানের কর্মীদের দেশে ফিরিয়ে এনে গুরুত্বহীন দায়িত্বে পাঠানোর ভয় দেখিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ
আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। এসব অনিয়ম এতটাই প্রকাশ্য যে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে বিষয়টি এখন ‘ওপেন সিক্রেট’ হিসেবে পরিচিত। তা সত্ত্বেও সরোয়ার্দীর বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান তদন্ত না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে- রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বারে কি তবে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় দুর্নীতির অলিখিত লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে?

এ বিষয়ে অভিযুক্ত সরোয়ার্দীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে তার ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, তিনি বরাবরের মতোই এসব অভিযোগকে ‘ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে এড়িয়ে চলছেন। শ্রমিক দল নেতা ফিরোজের বক্তব্য জানতে চাইলেও তার পক্ষ থেকেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

সচেতন মহলের মতে, দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ ধরনের রাজনৈতিক খোলস বদলানো সুবিধাভোগী ও তদবিরবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। এমনকি সম্প্রতি বিমানবন্দরে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গেও এই প্রভাবশালী চক্রের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *