বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২৬

ক্যাচমেন্ট জালিয়াতি ও বাণিজ্যের বিষবাষ্পে দগ্ধ মানিকগঞ্জের প্রাথমিক শিক্ষা

|| সেলিম মোল্লা | নিজস্ব প্রতিনিধি (মানিকগঞ্জ) ||

মানিকগঞ্জ জেলা শহরের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এক ভয়াবহ ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে। যে সরকারি স্কুল হওয়ার কথা ছিল সবার জন্য সমান সুযোগের আধার, সেখানে একটি প্রতিষ্ঠান এখন দুর্নীতির এক বিশাল ‘ব্ল্যাক হোল’-এ পরিণত হয়েছে। সরকারি সুযোগ-সুবিধা আর রাষ্ট্রের অর্থ ব্যবহার করে একদল শিক্ষক ও অসাধু সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে দুর্নীতির এক অপরাজেয় দুর্গ।

বিভিন্ন জালিয়াতি, শিক্ষার্থী এক স্কুলে কুক্ষিগত করা, অবাধ কোচিং বাণিজ্য এবং এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা চরম সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র দেখে আঁতকে উঠেছেন খোদ শিক্ষা সংশ্লিষ্টরাই।

শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত মানিকগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন ৮৮ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখন আর কোনো বিদ্যাপীঠ নয়, বরং এটি পরিণত হয়েছে একটি ‘কমার্শিয়াল ক্রাইম জোন’-এ। ক্যাচমেন্ট এরিয়া জালিয়াতি, শত শত শিশুকে কোচিংয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট করা এবং এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা চরম সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়— সব মিলিয়ে শিক্ষার পবিত্র মানচিত্র আজ কালিমালিপ্ত।

২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে টানা সরেজমিনে চালানো দীর্ঘ অনুসন্ধানে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা রীতিমতো রক্তহিম করা। সভ্য সমাজের জন্য এ এক অশনিসংকেত। এমন কিছু চাঞ্চল্যকর বিষয় উঠে এসেছে, যা কেবল শিক্ষাব্যবস্থাই নয়, বরং সামাজিক নৈতিকতাকেও চরম হুমকির মুখে ফেলেছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক ৫০ টাকা করে ভর্তি ফরম বিক্রি, ভর্তি বাবদ ৩০০টাকা আদায়, টিসি ও প্রত্যয়ন এর টাকা বাবদ হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা । অপরপক্ষে, প্রমোশনে না যাওয়া এবং প্রধান শিক্ষকের অনৈতিক কাজের সহযোগী হিসেবে পরিচিতরা কোচিং বাণিজ্য, শিট বিক্রি, গাইড ব্যবসার থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা। মানিকগঞ্জ জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অনেকগুলো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অবস্থিত যাদের একটি স্কুল থেকে অপরটি স্কুলের পায়ে হেটে দূরত্ব মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মিনিটের। আশেপাশের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী শূন্যতা থাকলেও ৮৮ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চলছে রমরমা ব্যবসা। অভিভাবকদের আকৃষ্টের উপায় হলো নভেম্বর মাসে ভর্তি ফরম বিক্রি, ডিসেম্বর মাসে ভর্তি পরীক্ষা, জানুয়ারি মাসের প্রথম তারিখ থেকেই কোচিং এ ভর্তি, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকেই বিষয়ভিত্তিক শীট দেওয়া প্রলোভন দেখানো যা থেকে ১০০% কমন নিশ্চয়তা, এবং সরকারের বিনামূল্যে বিতরণকৃত বই তোয়াক্কা না করে গাইড বই ধরিয়ে দেওয়া।

জানা গেছে, উল্লিখিত কাজগুলোর সাথে জড়িত থাকেন প্রমোশনে না যাওয়া শিক্ষক রুহুল আমিন, আনোয়ার, দিলরুবা, সালমা, গোবিন্দ। দীর্ঘদিন ডেপুটেশনে থাকা এবং বর্তমান স্থায়ী দুজন শিক্ষক কামরুন নাহার, সাদিয়া মান্নান এবং প্রাক প্রাথমিক নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক মৌসুমী আক্তার। আরও জানা গেছে, ঐ শিক্ষকবৃন্দ প্রত্যেকেই দুটি করে শ্রেণি শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।

এদিকে, পশ্চিম হাসলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাদিয়া মান্নান নামের এক সাবেক শিক্ষিকা যিনি দীর্ঘ ১৫ বছর ডেপুটেশনে থেকে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জের ৮৮নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থায়ীভাবে যুক্ত হন। জানা গেছে, ঐ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কয়েকবার এ শিক্ষককে তার বিদ্যালয়ে ফেরাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন এক অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কাছে। বর্তমানে পশ্চিম হাসলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ পদের শিক্ষকের পরিবর্তে মাত্র ৫ জন শিক্ষক রয়েছেন যা ঐ বিদ্যালয়টির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অন্তরায়।

এদিকে, ৮৮নং বিদ্যালয়টিতে ক্যাচমেন্ট ইস্যুতেও উঠে এসেছে নানা অনিয়মের তথ্য। স্কুলটির অনিয়মের জন্য প্রতিবেশী স্কুলগুলোতে বাজছে মৃত্যুঘণ্টা। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার (ক্যাচমেন্ট এরিয়া) বাইরে শিক্ষার্থী ভর্তি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রতিটি বিদ্যালয়ের একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা বা ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’ থাকে এবং ওই এলাকার শিশুদের সংশ্লিষ্ট স্কুলেই ভর্তি হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু ৮৮নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ‘বিশেষ প্রক্রিয়ায়’ বাইরের শিক্ষার্থী ভর্তি করছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থীরা ভুয়া বিদ্যুৎ বিলের কপি জমা দিয়ে বা মিথ্যা ঠিকানায় শহরের বাসিন্দা সেজে এখানে ভর্তি হচ্ছে। এর ফলে, পার্শ্ববর্তী ৯৮ নং পশ্চিম দাশড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৭২ নং পোড়রা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৬৭ নং শহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংকটে বিপন্ন।

শহরের ৯৮ নং পশ্চিম দাশড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। সেখানে সম্পূর্ণ স্কুলে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ৭০ জন। ওই স্কুলের শিক্ষিকা সামসুন্নাহার ক্ষোভের সাথে জানান, “আমাদের ক্যাচমেন্ট এরিয়ার শিক্ষার্থীরাও বিশেষ প্রক্রিয়ায় নিয়মবহির্ভূতভাবে ৮৮ নং স্কুলে চলে যাচ্ছে।”

স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল আহাদ আক্ষেপ করে জানান, তার স্কুলে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১০০-এর নিচে নেমেছে, অথচ পাশের ৮৮নং স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আড়াই হাজার ছাড়িয়েছে। তিনি বলেন, “আমাদের শিক্ষকরা যথেষ্ট প্রশিক্ষিত, আগে আমাদের অনেক শিক্ষার্থী ছিল। কিন্তু এখন ৮৮ নং স্কুল কর্তৃপক্ষ এমন এক ধারণা তৈরি করেছে যে সেখানে পড়লে নামকরা সরকারি হাই স্কুলে চান্স পাওয়া সহজ। আইন অনুযায়ী ক্যাচমেন্ট এলাকার বাসিন্দাদের ঐ এলাকার স্কুলেই ভর্তি করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত, তা না হলে আমরা চরমভাবে লুজার হচ্ছি।”

একই সুর ৭২ নং পোড়রা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কণ্ঠেও। প্রধান শিক্ষিকা এবং সহকারী শিক্ষিকা দীপা মন্ডল জানান, “৮৮ নং স্কুলটি একচেটিয়াকরণ বা মনোপলি তৈরি করেছে। তারা অন্য এলাকার বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও ভুয়া বিদ্যুৎ বিলের কাগজ দেখিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। আমাদের সামনে দিয়েই ৮৮ নং স্কুলের ইউনিফর্ম পরে শিক্ষার্থীরা যায়, অথচ তারা আমাদের ক্যাচমেন্ট এরিয়ার সন্তান। এটি দ্রুত বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।”

সবচেয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন ৬৭ নং শহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা আরিফা বেগম। তিনি বলেন, “ওরা (৮৮ নং স্কুল) কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করে না। আমাদের ভালো মানের বা ‘ক্রিম’ স্টুডেন্টদের টার্গেট করে নিয়ে যায়। আমাদের বিভিন্নভাবে টিসি দিতে বাধ্য করা হয়, না দিলে আমাদের ওপর নানাবিধ চাপ সৃষ্টি করা হয়। এটি সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক জুলুম।”

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভর্তি নীতিমালা (২০২৪-২৫ এবং ২০২৬ এর সংশোধিত বিধি) অনুযায়ী, প্রত্যেক বিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানা বা ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’র বাইরে শিক্ষার্থী ভর্তি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ ৮৮ নং স্কুলের প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র পুরো জেলার শিক্ষাব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।

পার্শ্ববর্তী স্কুলগুলোর শিক্ষকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাদের এলাকায় শিক্ষার্থী শূন্যতার মূল কারণ ৮৮ নং স্কুলের ‘অবৈধ আগ্রাসন’।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে পার্শ্ববর্তী স্কুলগুলোর ক্যাচমেন্ট এরিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী জালিয়াতির মাধ্যমে ৮৮ নং স্কুলে চলে গেছে, যা এক বিশাল পরিকল্পিত সিন্ডিকেটের অংশ।

বিদ্যালয়টি নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা গেছে আরও বিভিন্ন অনিয়মের ফিরিস্তি। বছরের মাঝখানে এবং সিট পরিপূর্ণ হওয়ার পরও বিদ্যালয়টিতে নির্দিষ্ট শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়ার শর্তে কৌশলীপন্থায় শিক্ষার্থী ভর্তির প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। এতে যে সকল অভিভাবক সম্মত হন তাড়াই কেবল সন্তানদের ভর্তির সুযোগ পান।

জেয়াসমিন (ছদ্মনাম) নামে এক অভিভাবক যিনি তার সন্তানকে বর্তমানে মানিকগঞ্জ ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসায় পড়াচ্ছেন তিনি বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। ছেলেকে মানুষ করতে শহরের বড় সরকারি স্কুলে দিতে চাইসিলাম। কিন্তু তারা ভর্তি নেয় নাই। লেখাপড়াতো আর বন্ধ করা যাইবো না। মাদ্রাসায় দিসি”।

এদিকে জেলার একটি সরকারি কলেজের এক স্টাফ তার ব্যক্তিগত পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে খুব সহজেই জেয়াসমিন যার সন্তানকে ভর্তি করা হলো না তার পরেই ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করেন।

শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের ঘিওর, হরিরামপুর বা সিঙ্গাইর উপজেলা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ৮৮ নং স্কুলে ভর্তি করতে ব্যবহার করা হচ্ছে এক অভিনব জালিয়াতি। স্থানীয় বাড়িওয়ালাদের বিদ্যুৎ বিলের কপি সংগ্রহ করে ভুয়া ভাড়াটিয়া সেজে ক্যাচমেন্ট এরিয়ার প্রমাণ তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে, পাশের ৭২ নং পোড়রা মডেল স্কুল এবং ৬৭ নং শহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আজ শিক্ষার্থী শূন্যতায় বিলীন হওয়ার পথে। ভর্তি বাণিজ্যের কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীরা মেকি জনপ্রিয়তার ফাঁদে পা দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন অন্যান্য শিক্ষকরা।

সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) ধারা অনুযায়ী, এটি সরাসরি ‘অসদাচরণ’ ও ‘দুর্নীতি’। এ বিদ্যালয়ে ক্যাচমেন্ট এরিয়ার আইন লঙ্ঘন করে ৩ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত (১:৩৫) বজায় রাখা অসম্ভব। এছাড়াও ‘প্রাথমিক শিক্ষা আইন-১৯৮৯’ অনুযায়ী শিক্ষার সুষম বণ্টন ব্যাহত করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ৬ নং ওয়ার্ডের ক্যাচমেন্ট এরিয়ার অধিকাংশ শিক্ষার্থীই জালিয়াতির মাধ্যমে ৮৮নং স্কুলে চলে গেছে। শহর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ বছর বয়সী ৩৪ জন শিক্ষার্থীর ৩১ জনই এখন ৮৮নং স্কুলের ছাত্র। এই ভয়াবহ অসমতা শিক্ষার ভারসাম্যতা নষ্ট করছে।

এদিকে, ভর্তি বাণিজ্য ও দুর্নীতিতেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে মানিকগঞ্জের এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। সরকার প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দিলেও ৮৮নং স্কুলে ভর্তি ও বই বিতরণের নামে ৩০০ টাকা আদায় এবং ‘মিষ্টি খাওয়ানোর’ নামে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। অভিভাবকরা জানিয়েছেন, শিক্ষকদের বিশেষ যোগাযোগ ছাড়া এখানে ভর্তি হওয়া প্রায় অসম্ভব।

এদিকে, কোচিং ও গাইড বাণিজ্যেও স্বর্গরাজ্য পরিণত হয়েছে এ স্কুল সংলগ্ন এলাকাটি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৮৮নং স্কুলের ভবন ঘেঁষে এবং পাশের কেন্দ্রীয় মসজিদের ওজুখানার আড়ালে ৮৮ এর শিক্ষক আনোয়ার, সালমা ও হাসিনার মতো প্রভাবশালীরা অবাধে কোচিং বাণিজ্য চালাচ্ছেন। ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা এবং বেলা ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলে এই রমরমা কারবার।

সরকারি ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২’ অনুযায়ী কোচিং কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হলেও এখানে তা ওপেন সিক্রেট। কোচিং বাণিজ্য নীতিমালা ২০১২’কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েই সরাসরি সরকারি বেতনভুক্ত শিক্ষকরা এ কোচিং বাণিজ্য চালাচ্ছেন।

অভিভাবকরা জানান, এই সিন্ডিকেটের কাছে কোচিং না করলে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় নম্বর দেওয়া হয় না, এমনকি নাম ডাকার সময়ও হয়রানি করা হয়।

অভিভাবকদের অভিযোগ, “স্কুলে পড়াশোনা কিছুই হয় না, আসল পড়া হয় কোচিংয়ে। পরীক্ষার আগে হুবহু কমন পড়া শিট ও সাজেশন কেবল কোচিংয়ের ছাত্ররাই পায়।”

সরেজমিন, ৮৮ নং স্কুল এলাকায় উপস্থিত হয়ে দেখতে পাওয়া যায় এক ভিন্ন জগৎ। সরকারি হাই স্কুল সংলগ্ন মসজিদ ঘেঁষে তৈরি হওয়া টিনের চালের ঘরে শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে ব্যাচ করে পড়াতে দেখা যায় ঐ সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের। আরও গভীরে অনুসন্ধানে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ওজুখানার পেছনে জলিল হুজুরের মসজিদ কোয়ার্টার নামে পরিচিত ঘরের ভেতরে অতি গোপনীয়ভাবে কক্ষ ভাড়া নিয়ে ৮৮ নং স্কুলের শিক্ষকরা কোচিং চালাচ্ছেন।

অভিভাবকদের সাথে ছদ্মবেশে কথা বলে জানা যায় এক ভয়ার্ত চিত্র। আলেয়া (ছদ্মনাম) নামে এক অভিভাবক জানান, “এখানে পড়ালেখা স্কুলে হয় না, হয় কোচিংয়ে। যে শিক্ষক যে ক্লাসের টিচার, তার কাছে না পড়লে বাচ্চাকে দেখতে পারে না, পরীক্ষায় নম্বর দেয় না। এমনকি সালাম দিলেও উত্তর নেয় না।”

তিনি আরও জানান, “প্রতি ব্যাচে ৪৫-৫৫ জন ছাত্র থাকে, বেতন বাবদ জনপ্রতি ১২০০ টাকা দিতে হয়। আর যারা কোচিং করে, শুধু তারাই পরীক্ষার আগে ‘স্পেশাল শিট’ ও সাজেশন পায়, যেখান থেকে হুবহু প্রশ্ন আসে।”

অভিভাবক আলেয়া (ছদ্মনাম) আর্তনাদ করে বলেন, “এখানে পড়ালেখা স্কুলে হয় না, হয় কোচিংয়ে। ক্লাসের শিক্ষকই যখন কোচিং করান, তখন সেই শিক্ষকের কাছে না পড়লে বাচ্চাকে ক্লাসে লাঞ্ছিত হতে হয়, পরীক্ষায় নম্বর কমিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি বোর্ড বই বাদ দিয়ে তাদের বানানো ‘শিট’ আর ‘সাজেশন’ কিনতে বাধ্য করা হয়, যা থেকে হুবহু প্রশ্ন আসে।” তিনি জানান, প্রাইভেট বা কোচিং না করালে অভিভাবকদের সাথেও করা হয় খারাপ আচরণ।

এ ব্যাপারে শিক্ষা বিশ্লেষকরা জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২’ এর স্পষ্ট লঙ্ঘন এটি। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারি শিক্ষক কোনোভাবেই নিজ প্রতিষ্ঠানের বা বাইরে কোচিং করাতে পারেন না। এটি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের এমপিও বাতিলসহ সরাসরি চাকরিচ্যুতির বিধান রয়েছে।

এখন এ সকল বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে—
• জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (DPEO) কি এই বিশাল মহাযজ্ঞ সম্পর্কে অন্ধ?
• সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন করে আড়াই হাজারের অধিক শিক্ষার্থী যখন এক স্কুলে জিম্মি করা হয়, তখন প্রশাসন কেন নীরব?
• মসজিদের ওজুখানার আড়ালে যখন সরকারি শিক্ষকরা কোচিং করান, তখন স্থানীয় সমাজ কেন প্রতিবাদী নয়?

এদিকে, বই বিতরণ ও ভর্তির নামে ৩০০ টাকা আদায় (যা সম্পূর্ণ অবৈধ), কোচিং ফি জনপ্রতি ১২০০ টাকা এবং ১০০০-এর অধিক শিক্ষার্থীর শিট ও গাইড বাণিজ্য মিলিয়ে এই সিন্ডিকেট প্রতি মাসে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

সরকারি ‘বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ’ নীতিমালার তোয়াক্কা না করে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে, যার ভাগ স্থানীয় প্রভাবশালী এবং একদল অসাধু কর্মকর্তার পকেটেও যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আইন বলছে, বইয়ের নামে টাকা নেওয়া সরাসরি দণ্ডনীয় অপরাধ। একচেটিয়া শিক্ষার্থী ভর্তির ফলে অন্য সরকারি বিদ্যালয়গুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় শিক্ষার সুষম বণ্টনের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।

এদিকে অনুসন্ধানের সবচেয়ে কালো অধ্যায়টি ফুটে ওঠে যখন জানা যায়, সন্তানদের এই তথাকথিত ‘নামি’ স্কুলে পড়ানোর নামে শহরে চাকচিক্যময় জীবন যাপন করতে গিয়ে দূরবর্তী উপজেলা থেকে আসা কিছু অভিভাবক অনৈতিক পথে পা বাড়িয়েছেন, যা ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অভিভাবক জানান, বোরকায় আবৃত হয়ে কিছু অভিভাবক সকালে সন্তানকে স্কুলে দিয়ে শহরের বিভিন্ন ফ্ল্যাটে ভাসমান পতিতাবৃত্তিতে লিপ্ত হন যা জেলা শহরের নৈতিক পরিবেশে চরম হুমকির সৃষ্টি করছে। এদের অধিকাংশের স্বামীই দেশের বাইরে অথবা ভিন্নস্থানে অবস্থান করছে।

অভিভাবক রহিমা খাতুন (ছদ্মনাম) জানান, জেলার ঘিওর, হরিরামপুর বা দৌলতপুর থেকে আসা কিছু নারী হাত-পা মোজা ও বোরকায় আবৃত হয়ে স্কুলে আসলেও, সন্তানদের কোচিংয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে তারা ভিন্ন রূপ ধারণ করেন। শহরের বিভিন্ন এলাকায় তারা পূর্বনির্ধারিত খদ্দেরদের কাছে দেহব্যবসা করেন।

অনুসন্ধানের সবচেয়ে বীভৎস ও হৃদয়বিদারক দিকটি হলো— সন্তানকে এই তথাকথিত ‘বিখ্যাত’ স্কুলে পড়ানোর নামে কিছু অভিভাবকের নৈতিক পতন। এটি এক ভয়াবহ নৈতিক স্খলন, যা শিক্ষার পবিত্র প্রাঙ্গণকে চরমভাবে কলুষিত করছে। নামি স্কুলে পড়ার লোক-দেখানো জীবন আর কোচিং কেন্দ্রীক ভিন্ন মানসিকতার লোকের সাথে মিশে তারা এই অন্ধকার পথ বেছে নিয়েছেন। এটি কেবল একটি স্কুলের ব্যর্থতা নয়, এটি পুরো মানিকগঞ্জ শহরের সামাজিক অবকাঠামোর ওপর এক পৈশাচিক আঘাত।

এই দীর্ঘ অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয় যে, মানিকগঞ্জ জেলা শহরের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এক ভয়াবহ ‘প্রাতিষ্ঠানিক মোড়ক’ দেখা দিয়েছে। ৮৮ নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে একটি শিক্ষার মাফিয়া চক্র গড়ে উঠেছে। একদিকে আইন ভাঙার মহোৎসব, অন্যদিকে অন্য বিদ্যালয়গুলোকে ধ্বংস করার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। এই অরাজকতা আর কতদিন চলবে? জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিস কি এই বিপুল দুর্নীতির ভাগীদার, নাকি তারা অসহায়? নাকি তারা জানেই না এত সকল ব্যাপার?

প্রশ্ন উঠেছে— শিক্ষার নামে জেলার এ মহাবাণিজ্য, নৈতিক ধ্বংসলীলা ও দুর্নীতির ক্যানসার থামাবে কে?

এদিকে, অভিযোগগুলোর ব্যাপারে ৮৮নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঐ শিক্ষকদের সাথে কথা বললে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। তারা ব্যাপারগুলো নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি হন নি, তবে সামনাসামনি দেখা করতে অনুরোধ জানান। এদিকে, কয়েকজন শিক্ষককে ফোন করলে তারা ফোন না ধরে বরং তা বন্ধ করে দেন।

তবে মৌসুমী ইয়াসমিন নামে ঐ বিদ্যালয়টির শিশু শ্রেণির শ্রেণি শিক্ষিকা (যিনি একাধিক কমিটির দায়িত্বে অন্তর্ভুক্ত) জানান, “প্রধান শিক্ষক আমাদের টাস্ক দেন, আমরা নেই। সবাই তো আর কাজ করে না, আর আমি একা না, সবাই থাকে। প্রধান শিক্ষক যা অর্ডার করে আমরা তাই করি। এখন, আমি করি দেখে হয়তো আমাকেই দেয়, বিষয়টা এমন”। এসময় তিনি এককভাবে এক শিক্ষককে একাধিক দায়িত্ব দেয়ার বিষয়টি ‘একদম ঠিক না’ উল্লেখ করে বলেন, আমাদের ২৫ জন শিক্ষক, এখানে সবাই ইনভলভড।

শিশু শ্রেণিতে কোচিং বাণিজ্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “বাচ্চাদের মায়েরা পড়াতে আনেন। আমি একা পড়াই বিষয়টা এমন না, আরও অনেকেই পড়ান। যারা শিশু শ্রেণির ক্লাস টিচার তারা সবাই পড়ান। এটা জোরপূর্বক কিছু না”। এসময় শিশুদের কোচিং করানো কতটুকু যৌক্তিক এ প্রশ্ন করতে ঐ শিক্ষক নিজেই কোচিং করানোর ব্যাপারটি অস্বীকার করে ফেলেন। পুনরায় প্রশ্ন করলে ঐ শিক্ষক বলেন, বারেবারে আমার নামই কেনো আসে? কোচিং তো সবাই করায়! সিলেবাসের বাইরে শিশুদের পড়ানো এবং তাদের এতে মানসিক চাপ হয় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি আমি দিয়েছিলাম না (পড়িয়েছিলাম না), অন্য টিচার দিয়েছিলেন।

এদিকে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক বজলুর রহমান বিশ্বাস শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ” এ ব্যাপারে আমি জানি। আমাদের স্কুল ছুটির আগে-পরে প্রাইভেট পড়ানো হয়, কিন্তু কোথায় পড়ায় সেটি জানি না।”

ক্যাচমেন্ট এরিয়া জালিয়াতির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ স্কুলের পড়ার মান খুবই ভালো। পড়ার মান ভালো হওয়াতে ভর্তির আগে অভিভাবকরা বাসা ভাড়া নিয়ে কাগজপত্র জমা দেয়।” এতে অন্য স্কুলের শিক্ষার্থী ক্রমশ কমে যাচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “পশ্চিম দাশড়া সরকারি স্কুলে ভবনই নাই। ভাড়া বাসায় স্কুল হয়! অন্য স্কুলের চেয়ে আমার স্কুলের লেখাপড়ার মান ভালো”।

শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে ৩০০ টাকা করে আদায়ের ব্যাপারে তিনি বলেন, “পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বাবদ ৫০ টাকা করে নেয়া হয়। ডায়েরি ও অন্যান্য বাবদ ২২০ টাকা নেয়া হয়। এসবে ডিসি স্যারের অনুমোদন আছে”। ডেপুটেশনে শিক্ষক স্থায়ীকরণের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাদের টিইও স্যার ও ডিপিইও স্যার সমন্বয় বদলির একটা চিঠি করে ঐটা ডিজি অফিসে পাঠায়। এরপর, সাদিয়া মান্নানসহ মোট ৬জন শিক্ষককে এখানে স্থায়ী করা হয়। এতে ঐ বিদ্যালয় (পশ্চিম হাসলী ও অন্যান্য) ক্ষতিগ্রস্তের ব্যাপারে তারাই জানেন, আমি কিছু জানি না”।

এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার সহকারী শিক্ষা অফিসার (ক্যাচমেন্ট তদারকির দায়িত্বে) আবু বকর সিদ্দিক অনুসন্ধানে উল্লিখিত ক্যাচমেন্ট জালিয়াতির প্রক্রিয়াটির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘৮৮ নং স্কুলটির প্রধান শিক্ষকে আমি ভর্তি প্রক্রিয়া সচ্ছল রাখার নির্দেশনা দিয়েছি। আমি বলেছি, আমার শিক্ষার্থী বাড়ানোর প্রয়োজন নাই, বিদ্যমান স্টুডেন্টদের প্রাথমিক শিক্ষার মান নিশ্চিত করাই আমাদের বর্তমান লক্ষ্য। অন্য ক্যাচমেন্ট এরিয়ার শিক্ষার্থী এ স্কুলে আনলে তা বরদাস্ত করা হবে না’।

এসময় তিনি সরকারি বিধি মোতাবেক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস প্রদান করেন।

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীর অসমতা ও ৮৮নং সরকারি বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট জালিয়াতি এবং কোচিং বাণিজ্যের ব্যাপারটি স্বীকার করে নিশ্চিত করেন যে এ ব্যাপারটি নিয়ে ইতিমধ্যে তিনি অন্য বিদ্যালয়গুলো থেকে অভিযোগ পেয়েছেন।

তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় শুনেছি বিদ্যালয়টির ভর্তি সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে সমস্যা আছে। এর পাশেই একটি হাইস্কুল আছে। এখানকার পাব্লিক পার্সেপশান হলো —‘এখানে পড়লেই পাশের হাইস্কুলে ভর্তি হওয়া যায়’!

শিক্ষক ডেপুটেশন ও অনিয়মের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘‘ঐ শিক্ষক দীর্ঘদিন ৮৮ স্কুলে কর্মরত ছিলেন, যা সদর অফিস বা জেলা অফিসের কনসার্ণে হয়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাকে ডেপুটেশন দিয়েছিলেন সেটিই আমরা জানি এবং এটি এখতিয়ার বহির্ভূত’’।

এসময় তিনি তার অধীনস্হ কর্মকর্তা এটিইও আবু বকর সিদ্দিককে ব্যাপারটি নিয়ে তদন্ত করতে নির্দেশ প্রদান করেন।

এদিকে ৮৮নং বিদ্যালয়ের নানা অনিয়ম, ক্যাচমেন্ট জালিয়াতি, ডেপুটেশনে থাকা শিক্ষককে স্থায়ীকরণ ও বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে মানিকগঞ্জের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার গোকুল চন্দ্র দেবনাথের সাথে যোগাযোগ করা হলে এ ব্যাপারে তিনি কোনো সদুত্তর বা আশানুরূপ উত্তর দিতে পারেন নি বরং তথ্যগুলো হোয়াটসঅ্যাপে প্রেরণ করতে বলেন। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি সাংবাদিককে অফিসে চা খাওয়ার দাওয়াত দেন।

জেলার সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও এ সকল ব্যাপার নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন।

সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’র মানিকগঞ্জ জেলা সভাপতি প্রফেসর মো. ইন্তাজ উদ্দিন বলেন, “প্রাইমারি স্কুলে যারা এখন শিক্ষকতা করে তাদের অনেকে শিক্ষকতা পেশাকে ব্যবসা হিসেবে নিয়েছে। ৮৮ নং স্কুলটির অভিভাবকরা মনে করে স্কুলটিতে পড়লেই পাশের সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া সম্ভব। বিদ্যালয়টির লেখাপড়ার মান খারাপ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফেইসবুকে বিভিন্ন সময় দেখেছি ঐ বিদ্যালয়ের নারী শিক্ষকরা বাসাবাড়িতে সেলাই কাজ এবং শিক্ষার্থীদের দিয়ে চুল আচড়ের মতো কাজ করেন।” এসময় তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে এ বিষয়ে সোচ্চার হতে আহ্বান জানান।

মানিকগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও জেলা সিপিবির সভাপতি প্রফেসর আবুল ইসলাম সিকদার দুঃখ করে বলেন, “এখানকার কিছু শিক্ষক আছে যাদের ক্লাসে পড়ানোর চাইতে কোচিং সেন্টারে মনোযোগ বেশি।” তিনি জানান, এখানকার শিক্ষকরা শিট বিক্রি করে এবং হাজার হাজার টাকার বাণিজ্য করে। এখানকার শিক্ষকরা আনকালচার্ড এর মতো। এরা অন্যদের সম্মান করে না। আমার ধারণা, এদের দুর্বলতাগুলো যেকোনো সময় প্রকাশ পাবে বলে অন্যদের এরা ইগনোর করতে চায় বা দূরে থাকতে চায়।”

এসময় তিনি বিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংখ্যা সমন্বয় করতে ও ৮৮ নং স্কুলের ব্যাপারে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবী জানান।

মানিকগঞ্জের প্রাথমিক শিক্ষার এই উদ্বেগজনক চিত্র নিয়ে এ অনুসন্ধানের দিকনির্দেশনাকারী সাংবাদিক খাব্বাব হোসেন ত্বহা বলেন, “একটি জেলার শিক্ষার মেরুদণ্ড হলো তার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু মানিকগঞ্জে যে চিত্র এ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমি সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ দপ্তরগুলোকে অতিদ্রুত এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে আইনি ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করবো।”

সার্বিক বিষয়ে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, “গ্রামের অনেক স্কুলে স্টুডেন্ট পাওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু শহরের স্কুলে স্টুডেন্ট ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশী। আসলে কি কারণ এখানে ঘটেছে এটা আমাদের একটু খুঁজে দেখতে হবে। আমরা এ বিষয়টি পর্যালোচনা করবো এবং শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে আমরা খোঁজ নেবো যে আসলে কোন কারণে বা কেনো এ স্কুলটি (৮৮ নং বিদ্যালয়) এতো বেশি স্টুডেন্ট পাচ্ছে এবং অন্য স্কুল পাচ্ছে না! আমাদের আওতাভুক্ত যে সমাধানগুলো আছে, আমরা সেগুলো অবশ্যই করার চেষ্টা করবো এবং এখানে কোনো অন্যায় হয়ে থাকলে আমরা সেটি এড্রেস করবো।”

৮৮নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই সরাসরি কোচিং বাণিজ্যের সাথে যুক্ত যা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের আশেপাশেই- এটি আইনসিদ্ধ কি না এমন প্রশ্নে জেলা প্রশাসক বলেন, “কোচিং বাণিজ্যের সাথে শিক্ষকদের যুক্ত থাকার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ বিষয়ে প্রত্যেকটি টিচারকেই আমাদের অবহিত করা আছে।”

এসময়, জেলা প্রশাসক ‘যদি কেউ (সরকারি বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক) কোচিং বাণিজ্যের সাথে যুক্ত থাকেন’ তবে সেটি তদন্ত করে পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস প্রদান করেন।

সবশেষ, এই ক্যান্সার কাটতে হলে কেবল বদলি নয়, বরং অভিযুক্ত শিক্ষকদের সরাসরি বরখাস্ত এবং ক্যাচমেন্ট এরিয়া জালিয়াতির বিরুদ্ধে জুডিশিয়াল ইনভেস্টিগেশন প্রয়োজন। অন্যথায়, আজ যে শিশুরা এই ‘চুরির শিক্ষায়’ বড় হচ্ছে, তারাই আগামী দিনে জাতির কপালে কলঙ্কের তিলক এঁকে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *