
|| বাপি সাহা ||
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প। অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গার্মেন্টস অনেক ভূমিকা রেখে চলেছে। দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার ক্ষেত্রে গার্মেন্টস-এর বিকল্প নেই। প্রবাসীদের আয়ের উৎস থেকে যে রেমিট্যান্স দেশের ঘরে ঢোকে সেই অর্থে আমাদের বিলাসবহুল জীবনযাপন চলে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে অবদান রেখেছে সেটি কিন্তু কোনো অংশে কম নয়। বাংলাদেশ এখন নির্বাচনী ট্রেনে—এ কথা যেমন সত্য ঠিক তেমনিভাবে সত্য একটি কঠিনতম সময়ের মধ্য দিয়ে দেশ চলেছে। যাই বলি না কেন দেশবাসী একটি নির্বাচিত সরকার দেখতে আগ্রহী। দেশের উন্নয়নে ভিন্ন দেশের বিনিয়োগ—এর বিকল্প নেই। বিনিয়োগের বিকল্প কোনো কিছু ভাবার অবকাশ নেই। বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা একটি কঠিন বিষয়। বৈদেশিক বিনিয়োগ ছাড়া কোনোভাবেই জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। একটি কথা আমাদের সকল সময় মনে রাখতে হবে—বাণিজ্যে বসতি লক্ষ্মী।
আমাদের দেশে বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্র হচ্ছে তৈরি পোশাক শিল্প। বিগত বেশ কিছুদিন আমাদের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। বহির্বিশ্বের বাজার ধরতে বর্তমানে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমাদের অর্থনীতির উন্নয়ন আমাদের হাতে—এর কোনো কল্প নেই। বর্তমান চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা আরেক ধরনের সংকট তৈরি করেছে। যথাসময়ে রপ্তানি পণ্য জাহাজজাতকরণ সম্ভব না হলে ক্ষতি কিন্তু আমাদেরই হবে। যে ক্ষতি সাধিত হবে সেটি কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের পোহাতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে আমাদের। আমাদের দেশের রপ্তানি পণ্যের মাধ্যমে যে বৈদেশিক অর্থ দেশে প্রবেশ করে তার সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রেখেছে। বাংলাদেশের নারীরা তৈরি পোশাক খাতে যে অবদান রাখছে তার মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতিতে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। আমাদের অর্থনীতির একটি বড় অংশ নির্ভর করে তৈরি পোশাক শিল্পের উপর। আমাদের শ্রমিকদের ঘামে তৈরি পোশাক খাত—সেই পোশাক খাতের উন্নয়ন ছাড়া আমাদের অর্থনীতি খুব একটা এগোতে পারবে না।
বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির পরিবর্তন হচ্ছে যুগের প্রয়োজনে। ইতিমধ্যে ভারতকে বিশাল সুখবর দিলেন ট্রাম্প, ধন্যবাদ জানালেন মোদি। ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক কমিয়ে ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ নামিয়ে এনেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ভারতের সাথে তার সম্পর্ক জোরালো করতে। এই সম্পর্ক কতটুকু জোরালো হবে সেটি নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। বৈশ্বিক রাজনীতির টালমাটাল অবস্থায় বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। বৈশ্বিক রাজনীতি পরিবর্তনশীল অবস্থায় রয়েছে। বিশ্ব রাজনীতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন তৈরি হয়েছে যাকে মোকাবিলা করেই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টিকে থাকতে হবে। পৃথিবী এখন দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অতিষ্ঠ নীতির ফলশ্রুতিতে ইউরোপের ২৭টি দেশের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরকে একটি বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে দাবি করছে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যারাই আসবে তাদের অনেক কঠিন অবস্থা মোকাবিলা করতে হবে। ইতিমধ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে পে-স্কেল কমিশন তাদের মতামত প্রদান করেছেন—বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে সেটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। নির্বাচিত সরকারের হাতে পে-স্কেল বাস্তবায়নের যে দায়িত্ব তুলে দিলেও সেটি হবে নতুন সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক খাত বর্তমানে একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিযোগ্য পণ্য হচ্ছে গার্মেন্টস শিল্প। এই পোশাক শিল্পের উপর নির্ভর করে আছে বাংলাদেশ।
বার্ষিক ২০২৪–২০২৫-এর হিসাব অনুসারে চায়না প্রথম স্তরে অবস্থান করছে তৈরি পোশাক শিল্প উৎপাদনের ক্ষেত্রে। আন্তর্জাতিক বিশ্বে ৩০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পের বাজারে হাঁটু গেড়ে বাণিজ্য করছে চায়নার পোশাক শিল্প। সর্বোচ্চ ১০টি যথা ভারত, তুরস্ক, ইতালি, জার্মানি, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া এবং পাকিস্তান তৈরি পোশাক শিল্পে বাণিজ্য করছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ শীর্ষ প্রস্তুতকারক সেরা পোশাক রপ্তানিকারকদের তালিকায় টেক্সটাইল এবং পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী শীর্ষস্থানীয়, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক (জগএ) হিসেবে স্থান পেয়েছে। বিজিএমইএ বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের নেতৃত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশকে অনেকটা প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হবে।
অনেকটা মার্কিন চাপে অতিষ্ঠ হয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে ভারতের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। এই মুহূর্তে ভারত অনেকটা ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। হিসাবটা অনেকটা পাল্টে দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ভারতীয় চুক্তি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের ধাক্কা সামলে ওঠার পাশাপাশি পোশাকের ব্যবসায় বাংলাদেশকেও টেক্কা দেওয়ার আশা করছে ভারত। ওই চুক্তির আওতায় ভারত থেকে যেসব পণ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭ দেশের বাজারে প্রবেশ করবে, তার বেশির ভাগই বিশেষ সুবিধা পাবে। ভারতীয় পোশাক পণ্যের ওপর ইউরোপের বিদ্যমান প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক শূন্যে নেমে আসবে। চামড়াজাত পণ্য, সামুদ্রিক পণ্য, হস্তশিল্প ও গয়নার মতো ভারতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক কমানো হবে, বা বিনা শুল্কে প্রবেশাধিকার পাবে।
প্রায় দুই দশকের আলোচনার চূড়ান্ত পরিণতি দিয়ে গত মঙ্গলবার এই বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন এবং ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ভারতের সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে এটি ২০২৭ সালে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। ভারতের জি নিউজ এক প্রতিবেদনে লিখেছে, এই চুক্তির ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের ব্যবসার বড় অংশ ভারতের দখলে চলে যাবে বলে দিল্লি আশা করছে।
১৯৭৫ সাল থেকে ইউরোপের এলডিসি বাণিজ্য সুবিধার আওতায় অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার পেয়ে বাংলাদেশ ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারীতে পরিণত হয়েছে। ডেনিম, ট্রাউজার ও টি-শার্টের মতো কিছু পণ্যে বাংলাদেশ চীনকে ছাড়িয়ে গেছে। ইইউতে শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় চীনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। এরপর রয়েছে তুরস্ক, ভারত, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৫০ শতাংশের বেশি গেছে ইউরোপীয় দেশগুলোতে, যার পরিমাণ এক হাজার ৯৭১ কোটি ডলার। ইইউর সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য চুক্তির পর দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল বলেন, ভারত খুব দ্রুতই ইউরোপে টেক্সটাইল রপ্তানি সাত বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩০ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলারে নিতে পারবে বলে তিনি আশা করেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের সব সময় জিজ্ঞেস করা হতো, বাংলাদেশ কীভাবে ইউরোপে এত বেশি রপ্তানি করে। তারা শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত এবং ৩০ বিলিয়ন ডলারের বাজার দখল করেছিল।”
জি নিউজ লিখেছে, ইইউর বাজারে ভারতীয় পোশাক রপ্তানি বাড়লে প্রতিযোগিতামূলক দাম ও পণ্যের মানের কারণে বাংলাদেশ চাপে পড়বে। ভেনিজুয়েলা মার্কিন আগ্রাসী হামলার পরবর্তী পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রত্যাশা ছিল তেলসমৃদ্ধ ভেনিজুয়েলার তেল দখল করা—সেটি তারা করতে পেরেছে এবং ভারতকে আগ্রহী করে তুলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তরল করার জন্য হয়তোবা ভারত তেল কিনতেও পারে, কিন্তু ভারত চাইবে রাশিয়া থেকে কম মূল্যে এই তেল ক্রয় করতে।
বাংলাদেশের চার হাজার পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। ৪ থেকে ৪.৫ মিলিয়ন মানুষ এই পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি আমাদের পোশাক শিল্প। ৩–৪ মিলিয়ন দক্ষ কর্মী এই পোশাক শিল্পের সাথে জড়িত। বাংলাদেশে অধিকাংশ পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ এবং নরসিংদী এলাকায় অবস্থিত। বাংলাদেশ যে পণ্য রপ্তানি করে থাকে তার মধ্যে ৯০ শতাংশ হচ্ছে তৈরি পোশাক।
ভারতীয় কূটনীতি ইতিমধ্যে সফল হয়েছে। আমাদের কূটনীতি যদি সফলতার মুখ না দেখে তাহলে আমাদের পোশাক শিল্পের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে। কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে—অন্যথায় ক্ষতিগ্রস্ত হব আমরা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতকে যে সুবিধা দিতে চলেছে তাতে মনে হয় তাদের পররাষ্ট্রনীতি অনেকটা সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারতমুখী অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে আমাদের এখন থেকেই ভাবতে হবে।
লেখক: আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও উন্নয়নকর্মী (খুলনা)।
