
|| বাপি সাহা ||
এশিয়ার রাজনীতিতে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন অনেক উত্তেজনা চলছে। সামনে নির্বাচন সমাগত। দেশ এখন নির্বাচনী জোয়ারে ভাসছে। প্রত্যাশা একটি ভালো নির্বাচন। গত ২৬ জানুয়ারি ভারত তার ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবস পালন করল। এককথায় বলা যেতে পারে, ভারতবর্ষের জন্য ২৬ জানুয়ারি একটি অন্যতম দিন। জাতীয় দিবসগুলো প্রত্যেক জাতির জন্য একটি অন্যতম দিন—এ কথা নিয়ে মনে হয় কোনো দ্বিমত নেই। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় এই দিনগুলো পালন করা হয়ে থাকে।
আজকের লেখাটির মূল বিষয় হচ্ছে ভারতের কূটনীতি। ভারতে কূটনীতি অনেকটা অগ্রসরমান। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অমিত মিশ্রি এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রণধীর জয়সোয়াল। রণধীর জয়সোয়াল ১৯৮৮ সালের ফরেন সার্ভিস অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। বিভিন্ন মিশনে তিনি কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি দিল্লিতে ফরেন সার্ভিসের দায়িত্ব পালন করছেন এবং মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামলাচ্ছেন এস. জয়শংকর। অনেকটা ধৈর্য, দক্ষতা ও সাহসিকতার সঙ্গে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামলাচ্ছেন। ভারত বর্তমানে এমন একটি অবস্থানে আছে—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব রেখে সামনের দিকে তার অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হচ্ছে। বৈদেশিক নীতিমালায় ভারত এখন সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে নিজেকে উপস্থাপন করছে নিজের অর্থনীতির উন্নয়নের লক্ষ্যে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী শুল্ক নীতির ফলশ্রুতিতে অনেক দেশকে পিছু হটতে হচ্ছে। এই মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করতে হলে বেশ কৌশলে মাঠে নামতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। মার্কিন বাজারে প্রবেশ করাটা অনেক কঠিন।
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরালো করার জন্য ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনেকটা জোরেশোরে মাঠে নেমেছে। যদিও সম্পর্ক অনেক ভালো। রাশিয়া ভারতের পরীক্ষিত বন্ধু—সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। মার্কিন চাপের মুখে থাকলেও ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে অনেকটা কম মূল্যে তেল কিনতে আগ্রহী। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অনেক পুরোনো এবং বিশ্বাসের। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যে সহযোগিতা রাশিয়া করেছে, সেটি কিন্তু ভুলে যাওয়ার নয়। মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা যাবে না। ভারত ও রাশিয়া যে সহযোগিতা করেছে, সেটিও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করতে হবে। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর যে অবদান, সেটিও কিন্তু কোনো অংশে কম নয়। যে সকল ভারতীয় সৈন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা থাকবে চিরকাল।
যাই হোক, যে বিষয়টি নিয়ে লিখছিলাম—ভারত চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সখ্যতা তৈরি করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে ব্যস্ত। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আফগানিস্তান। ভারত তার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে বিদেশি বিনিয়োগ টানার চেষ্টা করছে। আমরা যাই বলি না কেন, অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে হলে অবশ্যই বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আমরা অনেকটাই ব্যর্থ বিদেশি বিনিয়োগ টানতে।
মূল আলোচনায় আসা যাক। প্রজাতন্ত্র দিবস পালনকালে ভারত ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে যে চুক্তি করেছে, সেটির ফলে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল ভারত। সম্প্রতি ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে হস্তক্ষেপ করার একটি ইচ্ছা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প অনেকটা ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু ট্রাম্প সাহেবের দুঃখ একটাই—তিনি ইরানকে আক্রমণ করতে পারেননি ভারত, রাশিয়া, চীন ও আফগানিস্তান এক থাকার ফলে। ইরানের ওপর অর্থনীতিকে চাপ প্রয়োগ করার একটি অর্থহীন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ভারত তার কূটনৈতিক সাফল্যের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে অনেকটা সাফল্য পেতে চলেছে।
সম্প্রতি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে চীন যে বিবৃতি দিয়েছে, সেটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি অনেকটাই স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং বলেছেন, ভারত ও চীন ভালো প্রতিবেশী, বন্ধু ও অংশীদার। ভারতের ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসে দেশটির প্রেসিডেন্ট দ্রৌপদী মুর্মুকে পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তায় তিনি এ কথা বলেন। নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ের ইতিবাচক সম্পর্কে “ড্রাগন, হাতি একসঙ্গে নাচছে”—এমন ধরনের কথা বলেছেন।
চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির এই নেতা আরও বলেন, স্বাস্থ্যকর ও স্থিতিশীল সম্পর্কের জন্য উভয় পক্ষ নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা ও সহযোগিতা বাড়াবে এবং একে অপরের উদ্বেগগুলোকে বিবেচনায় নেবে বলে তিনি আশাবাদী। পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশের মধ্যে তিন হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা ঠিকঠাক চিহ্নিত নয়। সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ১৯৫০-এর দশক থেকে বিরোধও চলছে।
২০২০ সালে গালওয়ানে সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় ও ৪ জন চীনা সেনা নিহত হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি দেখা যায়। এরপর উভয় দেশই হিমালয়ের ওই সীমান্তে ব্যাপক অস্ত্রশস্ত্র ও সেনা মোতায়েন করতে থাকে। কিন্তু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের একের পর এক দ্বিপক্ষীয় সফরের পর গত বছর থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি দেখা যাচ্ছে। গত বছর তারা একে অপরের সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু করেছে।
আবার যে ব্যক্তিটির কথা চলে আসে, তিনি হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার মারমুখী পররাষ্ট্রনীতির কারণে ভারত ও চীন নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগও ক্রমে বাড়িয়ে চলেছে। চীনা নেতারা একাধিকবার জোর দিয়ে বলেছেন, দুই দেশের সীমান্ত সমস্যাকে সামগ্রিক চীন-ভারত সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করতে দেওয়া উচিত নয়। সীমান্ত বিরোধের যথার্থ কারণ থাকলেও এটি ২৮০ কোটিরও বেশি সম্মিলিত জনসংখ্যার দুটি দেশের মধ্যে একটি বহুমুখী সম্পর্কের মাত্র একটি দিক।
বাণিজ্য, উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য ও বৈশ্বিক শাসন—এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা কেবল সম্ভবই নয়, বরং অপরিহার্য। বহুপাক্ষিক ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো প্ল্যাটফর্মে এবং জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে টেকসই উন্নয়নের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চীন ও ভারতের গঠনমূলক সহযোগিতার জন্য বিশাল সুযোগ রয়েছে। বহুপাক্ষিক ফোরামে সমন্বয় খুঁজে বের করা একটি ইতিবাচক গতি তৈরি করবে, যার ফলস্বরূপ দ্বিপক্ষীয় সমস্যা সমাধানের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে।
বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে ভারত তার পররাষ্ট্রনীতিতেও পরিবর্তন করছে। “ড্রাগন, হাতি একসঙ্গে নাচছে”—এই রূপকে এগিয়ে যাবে ভারত ও চীন।
লেখক: বাপি সাহা, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও উন্নয়নকর্মী, খুলনা। ই-মেইল: sahabapi998@gmail.com
