সোমবার, জানুয়ারি ১২

শীতের হলুদে ঢাকা গোদাগাড়ীর মাঠ: সরিষা ফুলের সৌন্দর্য, মৌমাছির গুঞ্জন আর কৃষকের আশাবাদের দিন

|| অপু দাস | জেলা প্রতিনিধি (রাজশাহী) ||

শীতের ভোরে কুয়াশা সরতেই নরম রোদের আলো পড়ে গোদাগাড়ীর বিস্তীর্ণ মাঠে। শিশিরে ভেজা জমি তখন ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। চোখ মেললেই দেখা যায় দিগন্তজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হলুদ রঙের সমাহার। বাতাসে ভাসে সরিষা ফুলের মিষ্টি সুবাস। সেই সুবাসের আকর্ষণে মাঠজুড়ে উড়ে বেড়ায় অগণিত মৌমাছি। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাঠগুলো এই সময় যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা এক বিশাল জীবন্ত চিত্রপট।

দূর থেকে তাকালে মনে হয়, পুরো প্রান্তরজুড়ে কেউ হলুদের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। কোথাও কোথাও সরিষা ক্ষেতের পাশে সারিবদ্ধভাবে বসানো রয়েছে মৌচাষের বাক্স। মৌমাছির নিরবচ্ছিন্ন আসা-যাওয়ায় চারপাশ হয়ে উঠেছে কর্মচঞ্চল। কৃষকের যত্ন আর প্রকৃতির অনুকূলতায় বদলে গেছে গোদাগাড়ীর গ্রামীণ দৃশ্যপট।
শীতকালেই সরিষা ফুলের প্রধান সময়।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সরিষা ফুল সাধারণত শীতকালেই ফোটে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়কে সরিষা ফুল ফোটার মূল মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। এই সময় মাঠগুলো হলুদ ফুলে ঢেকে যায়, যা একদিকে চোখ জুড়ানো দৃশ্য তৈরি করে, অন্যদিকে কৃষকদের জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বয়ে আনে।

সরিষার বীজ সাধারণত মধ্য আশ্বিন থেকে কার্তিক মাসের মধ্যে, অর্থাৎ অক্টোবর-নভেম্বর সময়ে বপন করা হয়। বপনের পর শীতের শুরুতেই গাছে ফুল আসে। শীতের মাঝামাঝি সময়টিই সরিষা সংগ্রহ এবং মৌমাছির মাধ্যমে মধু আহরণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বলে মনে করেন কৃষক ও মৌচাষিরা।

সরিষা চাষে বাড়ছে আগ্রহ

চলতি মৌসুমে গোদাগাড়ীতে সরিষা চাষে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ভোজ্যতেলের বাজারদর বৃদ্ধি এবং সরকারি কৃষি প্রণোদনার কারণে অনেক কৃষক এবার সরিষা চাষের দিকে ঝুঁকেছেন। এর ফলে আগের বছরের তুলনায় আবাদি জমির পরিমাণও বেড়েছে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর গোদাগাড়ীতে ১৪ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। দোআঁশ ও বেলে-দোআঁশ মাটিতে সরিষা ভালো ফলন দেওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ আরও বাড়ছে।

মৌমাছির পরাগায়নে বাড়ছে উৎপাদন

সরিষা ফুলে মৌমাছির উপস্থিতি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই বাড়াচ্ছে না, বরং ফলন বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক কৃষক সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌচাষের বাক্স বসিয়েছেন। এতে একদিকে খাঁটি মধু সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে, অন্যদিকে মৌমাছির পরাগায়নের ফলে সরিষার দানা বড় ও পরিমাণে বেশি হচ্ছে।

একজন স্থানীয় কৃষক জানান, “শীতের সময় সরিষা ফুল আর মৌমাছি একে অপরের জন্য খুবই উপকারী। ফুল বেশি হলে মৌমাছিও বেশি আসে, এতে মধুও পাওয়া যায়, আবার সরিষার ফলনও ভালো হয়।”

কম খরচে বহুমুখী সুফল

সরিষা চাষে সেচ ও সারের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম। কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে বপন করা এই ফসল প্রাকৃতিকভাবেই ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। সরিষা গাছের পাতা ঝরে মাটিতে মিশে প্রাকৃতিক জৈব সারের কাজ করে। তেল উৎপাদনের পর যে খৈল পাওয়া যায়, তা গবাদিপশুর উৎকৃষ্ট খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এছাড়া সরিষা কাটার পর একই জমিতে বোরো ধান আবাদ করলে সারের খরচও কমে আসে। এসব কারণে সরিষা কৃষকদের কাছে কম ঝুঁকির অথচ লাভজনক একটি ফসল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

কৃষকের চোখে ভবিষ্যতের আশা

গোদাগাড়ীর কৃষকদের মধ্যে এখন আশাবাদী মনোভাব দেখা যাচ্ছে। নিজেদের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাজারে সরিষা ও মধু বিক্রি করে বাড়তি আয় করার স্বপ্ন দেখছেন তারা। সময়মতো বীজ, সার এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ পাওয়ায় এবারের ফলন নিয়ে সন্তুষ্ট কৃষক সমাজ।

কৃষি ও প্রকৃতির সহাবস্থান

কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, সরিষা চাষ কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের তেলবীজ উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ভোজ্যতেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকারের যে উদ্যোগ, গোদাগাড়ীর মাঠে ছড়িয়ে থাকা এই হলুদ প্রান্তর তারই বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

হলুদের চাদরে মোড়া গোদাগাড়ীর মাঠ তাই শুধু শীতের একটি মনোরম দৃশ্য নয়—এটি কৃষকের শ্রম, প্রকৃতির সৌন্দর্য আর আগামীর সম্ভাবনার এক জীবন্ত গল্প।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *